পনেরোটা বছর। একটা প্রজন্ম কার্যত ছোট থেকে বড় হয়ে গেল এই রাজ্যে। চাকরি নেই, মহার্ঘ ভাতা নেই, শিল্প নেই, বিনিয়োগ নেই। শুধু আছে প্রতিশ্রুতি, প্রকল্পের নাম, আর কাটমানির গল্প। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ বিধানসভায় যখন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন, তখন শুধু বাজেট পেশ হয়নি। একটা অন্ধকার যুগের ইতি টানা হল।
শুভেন্দু অধিকারীর নেতত্বাধীন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটের সবচেয়ে বড় কথাটা পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে মাপা যাবে না। এই বাজেটের ছত্রে ছত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষী উচ্চারণে এক দৃপ্ত মানসিকতার জলছাপ আঁকা, বুঝতে হবে সেই তাৎপর্য। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের পাহাড় রেখে গিয়েছে। সেটা স্বীকার করে নিয়েই নতুন সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিল, বাংলাকে আর দমানো যাবে না। কোনও প্রতিবন্ধকতাই উন্নয়নের গতি শ্লথ করতে পারবে না। এই সাহস দেখানো সহজ নয়। তবে রাজ্য রাজনীতির একজন অনুসন্ধিৎ ছাত্র হিসেবে বলাই যায়, এটা দুঃসাহস নয়। সৎ সাহস।
প্রথমেই সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতার প্রসঙ্গে আসা যাক। ১৮ থেকে ৩৮ শতাংশ, এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি, অক্টোবর থেকে কার্যকর। বছরের পর বছর ধরে রাজ্যের কর্মীরা রাস্তায় নেমেছেন, আদালতে লড়েছেন, অপমানিত হয়েছেন। তাঁদের সেই ক্ষত সম্পূর্ণ সারবে না হয়তো। কিন্তু আজকের ঘোষণা একটা স্পষ্ট সংকেত দিল। এই সরকার কর্মীদের শত্রু নয়।
এক লক্ষ সরকারি শূন্যপদ পূরণের ঘোষণা এই বাজেটের আরেকটি বড় পদক্ষেপ। তার মধ্যে ৫০ হাজার শিক্ষকপদ। শিক্ষা দফতরে যে দুর্নীতি ও নিয়োগ-জট গত এক দশকে বাংলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারে রেখেছিল, সেখানে আলো ফেলার প্রতিশ্রুতি এল। ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। মেয়েদের শুধু প্রকল্পে নয়, কাজেও জায়গা দেওয়ার ইচ্ছেটা এখানে পরিষ্কার।
বেকার যুবকদের জন্য ‘ভরসা কর্মসাথী’ প্রকল্পে মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতার ঘোষণা হয়েছে। সংখ্যাটা ছোট, কিন্তু বার্তাটা বড়। রাজ্য স্বীকার করছে যে তার হাতে এখনই পর্যাপ্ত কাজ নেই, তবে হাত ছেড়ে দেওয়া হবে না।
পরিকাঠামোয় যা ঘোষণা হয়েছে তা রীতিমতো চমকানোর মতো। কল্যাণীতে গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর, পূর্ব মেদিনীপুরে গভীর সমুদ্রবন্দর, পুরুলিয়া-বালুরঘাট-মালদায় নতুন বিমানবন্দর, উত্তরবঙ্গে IIT ও IIM… কেন্দ্রের সঙ্গে সুচারু সমন্বয়ে এই প্রকল্পগুলো আর কাগুজে শুকনো প্রতিশ্রুতি হিসাবে আটকে থাকার কথা নয়। যেমন বরাদ্দ হল, চিংড়িঘাটা-নিউটাউন উড়ালপথে ৯০০ কোটি, ভাগীরথীর উপর নতুন সেতুতে ১,২০০ কোটি। কলকাতার যানজট যাঁরা প্রতিদিন সহ্য করেন বা যাঁরা উত্তরবাংলার বাসিন্দা– তাঁরা জানেন, এই বরাদ্দের মানেটা কতটা গভীর।
মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা, পিঙ্ক কার্ড, অন্নপূর্ণা যোজনায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ, মেয়েদের পড়াশোনায় ৫০ হাজার টাকা বৃত্তি। এগুলো দেখে বোঝা যায়, নতুন সরকার জানে বাংলার মহিলারা নিছক ভোটব্যাংক নন, তাঁরা এই রাজ্যের ভিত।
বেঙ্গল এআই মিশনের ভবিষ্যৎমুখী ঘোষণাও চোখে পড়ার মতো। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাস্তবায়ন হলে এই একটি পদক্ষেপই রাজ্যের তরুণ প্রজন্মের গন্তব্য বদলে দিতে পারে।
বাজেট মানে প্রতিশ্রুতি। তার যাথার্থ্যের পরীক্ষা হয় বছর ঘুরলে। কিন্তু এটুকু বলা যায়, দীর্ঘ অন্ধকারের পর আজ বিধানসভায় যে বাজেট পেশ হল, তাতে অন্তত আলোর দিকে মুখ ফেরানোর ইচ্ছেটুকু স্পষ্ট।
ঘোষণাপর্ব শেষ। বাংলা এখন অপেক্ষায় আছে স্বপ্নের বাস্তবায়নের।