ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দায়ের হওয়া মামলায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। মঙ্গলবার বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্তের এজলাসে ভবানীপুর কেন্দ্রের ইভিএম, ভিভিপ্যাট এবং গণনা কেন্দ্র ও তার বাইরের সিসিটিভির ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়। আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনও তথ্য বা নথি মুছে ফেলা যাবে না বলেও স্পষ্ট জানানো হয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে দু’মাস পরে।
চলতি বছরের ৪ জুন রাজ্যের ২৯৩টি বিধানসভা আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভবানীপুর কেন্দ্রে মুখোমুখি লড়াইয়ে ছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। ফল ঘোষণার পর দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ১৫ হাজার ১১৪টি ভোটে পরাজিত হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই কলকাতা হাইকোর্টে নির্বাচন পিটিশন দায়ের করেন তিনি।
মঙ্গলবার মামলার শুনানির শুরুতেই বিচারপতি গৌরাঙ্গ কান্ত জানান, তাঁর দাদা রাজ্য বিজেপির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। সেই কারণে তিনি মামলাটি শুনতে পারবেন কি না, তা নিয়ে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং বিচারপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই।’ এরপরই বিচারপতি মামলার শুনানি গ্রহণ করেন।
শুনানিতে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক গুরুতর অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে ভোটগণনা চললেও ১৩ রাউন্ড পর্যন্ত এগিয়ে থাকার পর হঠাৎ পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ২০২১ সালের নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসারকে কেন নির্বাচনের মাত্র দু’মাস আগে ভবানীপুরে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি জেলা নির্বাচন আধিকারিকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
আইনজীবীর বক্তব্য, বিকেল তিনটে পর্যন্ত গণনা স্বাভাবিক নিয়মে চললেও এরপর একাধিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। এই বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের কাছেও অভিযোগ জানানো হয়েছিল বলে আদালতে দাবি করা হয়। ভবানীপুর কেন্দ্রে এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় প্রায় ৪৪ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল বলেও শুনানিতে উল্লেখ করেন তিনি।
শুনানির সময় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, ‘২০২১ সালের নন্দীগ্রাম নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া মামলার এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।’ ভবানীপুরের ক্ষেত্রেও যেন একই পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেই আবেদন জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, আদালত যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন এই মামলার একটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বিল্লোদল ভট্টাচার্য আদালতে জানান, হাইকোর্টের বিধি অনুযায়ী নির্বাচন পিটিশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলিকে নোটিশ জারি করা বাধ্যতামূলক। সকল পক্ষ আদালতে হাজির হওয়ার পরেই হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমেও নোটিশ জারির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের বর্তমান বিধি অনুযায়ী ভোটের ফল প্রকাশের পর ৪৫ দিন পর্যন্ত সিসিটিভি ও ওয়েবকাস্টিং সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ভিভিপ্যাট স্লিপ এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকে। তবে ওই সময়সীমার মধ্যে কোনও নির্বাচনী ফলাফল আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলে এবং আদালত নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট তথ্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে হয় বলেই জানিয়েছেন আইনজীবী আশীষ কুমার চৌধুরী।