পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস হঠাৎই পদত্যাগ করেছেন বৃহস্পতিবার। তাঁর এই সিদ্ধান্তের কারণ এখনও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। সূত্রের খবর, তিনি বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছেন এবং সেখান থেকেই রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আবহে এই আকস্মিক পদত্যাগ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে।
২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সিভি আনন্দ বোস। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের নভেম্বর মাসে। কিন্তু সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় ২০ মাস আগেই তিনি পদ ছেড়ে দিলেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যপালের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) তাঁর পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ‘আমরা বর্তমানে দিল্লিতে রয়েছি। রাজ্যপাল তাঁর ইস্তফাপত্র রাষ্ট্রপতি ভবনে পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
লোকভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাষ্ট্রপতি ভবন ইতিমধ্যেই সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে এখনও কোনও সরকারি ব্যাখ্যা সামনে আসেনি। আনন্দ বোস নিজেও এ বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি।
রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রাজ্যের নানা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে সরব ছিলেন বোস। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একাধিক নীতির সমালোচনাও করেছেন তিনি। তাঁর আমলে রাজ্য সরকার এবং রাজভবনের মধ্যে সম্পর্ক বহুবার তিক্ত হয়েছে। বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাতও প্রকাশ্যে এসেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আচমকা তাঁর পদত্যাগের ঘটনায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, বোসের পদত্যাগের পর আপাতত পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল আর এন রবিকে। আর এন রবির পূর্ণ নাম রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। তিনি প্রাক্তন আইপিএস আধিকারিক। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে তিনি তামিলনাড়ুর ১৫তম রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের রাজ্যপাল হিসেবেও কাজ করেছেন। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে সরকারের সঙ্গে একাধিক ইস্যুতে তাঁর মতবিরোধ ও বিতর্ক সামনে এসেছে। রাজ্যপাল হিসেবে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ, বিভিন্ন বিল দীর্ঘদিন আটকে রাখা— যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। নিট বিল নিয়ে মতানৈক্যের কারণে তিনি বারবার আলোচনায় এসেছেন।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের শেষ দুই স্থায়ী রাজ্যপালকেই মাঝপথে পদ ছাড়তে হয়েছে। আনন্দ বোসের আগে রাজ্যের রাজ্যপাল ছিলেন জগদীপ ধনখড়। তিনি পরে দেশের উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে রাজ্যের রাজ্যপালের পদ নিয়ে বারবার মাঝপথে পরিবর্তনের নজির তৈরি হয়েছে।
রাজ্যপালের এই ইস্তফার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সে লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের হঠাৎ পদত্যাগের খবর শুনে আমি গভীরভাবে বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন। এই মুহূর্তে তাঁর পদত্যাগের কারণ আমার জানা নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে কোনও রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রাজ্যপালের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়ে থাকতে পারে— এমন সম্ভাবনায় আমি অবাক হব না।’
মমতা আরো লিখেছেন, ‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে এইমাত্র জানিয়েছেন যে, আরএন রবিকে পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু এ বিষয়ে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। এই ধরনের পদক্ষেপ ভারতের সংবিধানের চেতনা খর্ব করে এবং আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তিকে আঘাত করে। কেন্দ্রের উচিত সহযোগিতামূলক যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিকে সম্মান করা এবং এমন একতরফা সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা, যা গণতান্ত্রিক রীতি ও রাজ্যগুলির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে।’
রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বলেন, ‘সিভি আনন্দ বোস আচমকা পদত্যাগ করেছেন। বিজেপি কি তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করেছে? আমাদের অবাক লাগছে। কিছুদিন বাদেই নির্বাচন। তবে কি কেন্দ্রীয় সরবার ও ভারতীয় জনতা পার্টি চায় না বাংলায় নির্বাচন হোক? এর ভেতরে কি অন্য কিছু লুকিয়ে আছে? বাংলায় কি রাষ্ট্রপতি শাসনের মনোবাঞ্ছা আছে?’ এমনই সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন চন্দ্রিমা।
চন্দ্রিমার কথায়, ‘তাহলে হঠাৎ কেন পদত্যাগ? বুধবারও রাজ্যের এক জেলায় সিভি আনন্দ বোসের যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার পরপরই এই সিদ্ধান্ত। মুখ্যমন্ত্রী সমাজমাধ্যমে লিখেছেন তাঁর সঙ্গেও কোনও আলোচনা করা হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, আর এন রবিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে অ্যাপোয়েন্টেড করা হয়েছে। অথচ আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ ব্যাপারে কোনও আলোচনা করা হয়নি। অদ্ভুত ব্যাপার! গণতন্ত্র কোথায়? সংবিধানের মান্যতা কোথায়? শুধুই কি ক্ষমতা দখলের জন্য ভারতীয় জনতা পার্টি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চাইছে? কেন্দ্রীয় সরকার দৃষ্টান্ত তৈরি করছে? আমরা হতবাক।’