ভোট লুট রুখে দিতে লড়বে বাংলা : মমতা

দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে হুগলির উত্তরপাড়া থেকে নিজের কেন্দ্র ভবানীপুর, ঝড়ের গতিতে একাধিক জনসভা ও পদযাত্রায় আক্রমণাত্মক সুরে প্রচার চালালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ— রেকর্ড ভোটদানের পর সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করতে পরিকল্পিতভাবে ভোটের গতি কমানোর চেষ্টা চলছে। এর পেছনে রয়েছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব ও কেন্দ্রীয় শক্তির অপব্যবহার। একের পর এক জনসভা থেকে মমতার বার্তা স্পষ্ট— ‘ভোট লুটের রাজনীতি রুখে দিতে শেষ পর্যন্ত লড়বে বাংলা।’

ভোট প্রক্রিয়া, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা, বিজেপির নির্বাচনী কৌশল এবং উন্নয়ন বনাম প্রতিশ্রুতির প্রশ্নে শনিবারের প্রচারে ঝড় তোলেন মমতা। উত্তরপাড়ার জোড়াপুকুর মাঠে তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে আয়োজিত সভা থেকে মমতা অভিযোগ করেন, প্রথম দফায় রেকর্ড ভোট পড়ার পর দ্বিতীয় দফায় ভোটদানের গতি কমিয়ে দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে। তাঁর দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর একাংশকে দিয়ে ভোটারদের লাইনে ধীরে ধীরে ঢোকানো, যাতে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে না পারেন— এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁর নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

উত্তরপাড়ার সভায় তৃণমূলনেত্রী অমিত শাহকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘আজকে সকালে আমার খুব প্রিয় ভাই, ‘মোটাভাই’ সিআরপিএফ-এর যাঁকে নন্দীগ্রামে ভোট লুঠ করতে পাঠিয়েছিলেন, তাঁকে নিয়ে মিটিং করেছেন৷ বলেছে ভোট স্লো করে দাও, লোকে যেন ভোট দিতে না পারে৷ আমার ভবানীপুরে দায়িত্ব দিয়েছে৷ আমার বয়েই গেছে, তোরা কাঁচকলা করবি আমার৷’ মমতার আরও অভিযোগ, ভবানীপুরে বহিরাগত ঢুকিয়েছে বিজেপি। গতকালও বাসে করে লোক আনা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।


নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিজেপি বিপুল শক্তি নিয়ে নেমেছে বলেও অভিযোগ তোলেন মমতা। তাঁর দাবি, ‘৫০টি হেলিকপ্টার, ১৯ জন মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, বাহিনী, সাঁজোয়া গাড়ি, ইডি-সিবিআই— সব নিয়ে নেমেছে বিজেপি।’ এই প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি রাজ্যের নির্বাচনে এত কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ কেন।
নাম না করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে মমতা বলেন, ‘বছরে ২ কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি কোথায়? দেশে বেকারত্ব বেড়েছে, আর বাংলায় কমেছে।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমোদি-প্রমোদি বাবুদের বলছি, বছরে ২ কোটি চাকরি দিয়েছেন ? আমরা চাকরি দিয়েছি। দেশে ৪০ শতাংশ বেকারি বেড়েছে। আর বাংলায় ৪০ শতাংশ বেকারি কমেছে। কোথাও যেতে হবে না, আপনি হাওড়া থেকে বর্ধমান একদিন ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে যান। দেখবেন চারদিকে শুধু ইন্ডাস্ট্রি, ইন্ডাস্ট্রি আর ইন্ডাস্ট্রি।’
ধর্ম নিয়েও বিজেপিকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর অভিযোগ, ধর্মের নামে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির প্রসঙ্গ, নিজের নামে স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং গান্ধী হত্যা প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এরা ধর্মের নামে সর্বনাশ করছে।’ একই সঙ্গে বিজেপির ‘মিথ্যে প্রতিশ্রুতি’ ও নির্বাচনের সময়ে বিভিন্ন প্রকল্পের ঘোষণাকেও কটাক্ষ করেন মমতা।

ভোট পরিচালনায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও সরব হন মমতা। তিনি অভিযোগ করেন, ‘দু’লক্ষ ফোর্স এনে ভোট ক্যাপচার করার চেষ্টা চলছে।’ পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের অতিরিক্ত সক্রিয়তার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এতে সাধারণ ভোটারদের সমস্যা হচ্ছে।

দিনভর প্রচারে উত্তরপাড়ার পর দমদম এবং ভবানীপুরে পদযাত্রা ও জনসভা করেন মমতা। ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়া এলাকায় সভা চলাকালীন প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের মাইকিং নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযোগ, পাশেই সভা করছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সেই শব্দদূষণে বিরক্ত হয়ে মমতা সভা মাঝপথেই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। আইনি পদক্ষেপেরও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। মঞ্চ থেকেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা প্রশ্ন তোলেন, ‘এভাবে কেন করা হচ্ছে ? নির্বাচনের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধী শিবির ইচ্ছাকৃতভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। প্রশাসনের ভূমিকাকেও ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর কথায়, ‘ওরাও যেদিন মিটিং করবে, তখন কি একইভাবে বাধা দেওয়া হবে ? তখন পুলিশ এসে আমাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেবে— এটাই হচ্ছে পার্শিয়ালিটি।’

এরপর পরিস্থিতি নিয়ে সরাসরি ফোনে কথা বলতেও দেখা যায় তাঁকে। শেষে মাইক হাতে নিয়ে কার্যত হতাশ সুরেই তিনি বলেন, ‘সব অনুমতি নিয়েই সভা করছি, তারপরও যদি এভাবে বাধা দেওয়া হয়, তা হলে কি সভা করা সম্ভব?’