ইসিআইনেট পোর্টালের কোডে শুধু বাংলার অফিসারদের জন্যই নিষেধাজ্ঞা: অডিট রিপোর্টে এবার ফাঁস নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল বৈষম্য

Gyanesh Kumar a puppet, must resign: Congress (Image: ANI)

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India-ECI) কেন্দ্রীয় ডিজিটাল পোর্টাল ইসিআইনেটের (ECINET portal) ওয়েব কোডে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী আধিকারিকদের ক্ষমতা খর্ব করার একটি বিশেষ ব্যবস্থা বা বিধিনিষেধের হদিশ মিলল। সিভিক-টেক সংস্থা চর্চাগ্রামের (Charchagram audit) করা এক নিরপেক্ষ প্রযুক্তিগত অডিটে ধরা পড়েছে যে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision-SIR) প্রক্রিয়ার সময়ে শুধুমাত্র বাংলার ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO) এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ইআরওদের (AERO) এনুমারেশন ফর্ম বা ভোটার যাচাইয়ের নথি দেখা এবং নোটিস-অ্যান্ড-হিয়ারিং ড্যাশবোর্ড ব্যবহারের পথ কোডিংয়ের মাধ্যমে আটকে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের অন্য কোনও রাজ্যের আধিকারিকদের ক্ষেত্রে পোর্টালের কোডে এই ধরনের কোনও নিষেধাজ্ঞা বা ব্যতিক্রম রাখা হয়নি।

কী মিলেছে অডিটে

 চর্চাগ্রামের ডেটা সায়েন্টিস্ট সৌরভ রাজপুত গত ২, ৬, ৭ এবং ৯ অক্টোবর ইসিআইনেট পোর্টালের পাবলিকলি সার্ভড ফ্রন্ট-এন্ড জাভাস্ক্রিপ্ট বান্ডল (front-end JavaScript bundle) পরীক্ষা করেন। এমনকি ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সংগৃহীত কোডেও এই বিশেষ বিধিনিষেধের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। রাজপুত জানিয়েছেন, পোর্টালের এসআইআর ফেজ-টু ল্যান্ডিং পেজে ভিউ এনুমারেশন ফর্ম ডিটেলস নামের যে টাইলটি রয়েছে, তা দেশের সমস্ত রাজ্যের আধিকারিকদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের ইআরও এবং এআরওদের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে হার্ড-কোড করে তা ব্লক বা নিষ্ক্রিয় রাখার কোড লেখা রয়েছে।


 একইভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত নোটিস পাঠানো এবং শুনানির কাজ ট্র্যাক করার জন্য তৈরি নোটিস-অ্যান্ড-হিয়ারিং ড্যাশবোর্ডেও বাংলার অফিসারদের প্রবেশাধিকার আটকানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অথচ এই ড্যাশবোর্ড ও ফর্ম ডিটেলস পেজেই ভোটারের নাম, এপিক নম্বর, বুথ লেভেল অফিসারের (BLO) সুপারিশ, আপলোড করা নথি এবং হিয়ারিং অর্ডারের যাবতীয় তথ্য থাকে। গবেষকদের মতে, তাঁরা শুধুমাত্র লগ-ইন করার আগে ব্রাউজারে লোড হওয়া পাবলিক ফ্রন্ট-এন্ড কোড পরীক্ষা করেছেন, কোনও অভ্যন্তরীণ সার্ভার বা পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেননি। অন্তত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬ অক্টোবরের নতুন বিল্ড পর্যন্ত এই কোডটি পোর্টালে সক্রিয় ছিল, তবে সার্ভার-সাইডে এটি ঠিক কবে থেকে এবং কীভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে তা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই অডিট সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনও জবাব দেয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরিপন্থী

 ইসিআইনেট পোর্টালের এই গোপন কোডিং সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরিপন্থী বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হর্ষিত আনন্দ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের ডিজিটাল নিষেধাজ্ঞা শীর্ষ আদালতের রায়ের সম্পূর্ণ বিরোধী। গত ২০ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে বাংলায় লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি বা তথ্যগত অসঙ্গতির শুনানির ভার বর্তমান ও প্রাক্তন বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের হাতে তুলে দিয়েছিল।

 শীর্ষ আদালত সেই সময়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, ভোটারদের জমা দেওয়া নথিপত্র যাচাই করে বিচারকদের সন্তুষ্ট করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট ইআরও এবং এআরওদের কাঁধে। হর্ষিত আনন্দের মতে, বিচারকেরা নিজেরা প্রাথমিক নথি যাচাই করেন না, তাঁরা ইআরও এবং এআরওদের রিপোর্টের উপরেই নির্ভর করেন। ফলে পোর্টালে অফিসারদের ফর্ম ও নথি দেখার পথ আটকে দেওয়া হলে বিচারকদের পক্ষেও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, গত ২১ ফেব্রুয়ারিই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ তুলেছিলেন যে, ইসিআইনেট পোর্টালে বাংলার ইআরওদের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা এআরওদের কাজের অগ্রগতি নজরদারি করতে পারছেন না, যা ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৩বি ও ১৩সি ধারার সরাসরি লঙ্ঘন। পাশাপাশি, রাজ্যের সিইও দপ্তরের বাছাই করা আধিকারিকদের এবং ২৫ জন মাইক্রো-অবজার্ভারকে দিয়ে সুপার চেকিংয়ের নামে বিধানসভা স্তরের অফিসারদের অনুমোদনে ভেটো দেওয়ার অভিযোগও আগেই উঠেছিল।

২৭ লক্ষ নাম ছাঁটাই ও ট্রাইব্যুনালে ৩৭ লক্ষ আপিলের পাহাড়

 গত বছরের ৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে শুরু হওয়া এই এসআইআর প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করেই নজিরবিহীন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত খসড়া তালিকায় শুরুতেই ৭.৮ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়ে। এরপর কমিশন লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির (logical discrepancy) আওতায় রাজ্যের ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে চিহ্নিত করে। নবান্ন ও নির্বাচন সদনের সংঘাতের আবহে ফেব্রুয়ারি মাসে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করতে হাজির হন।

 শেষ পর্যন্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকা এবং এপ্রিলের বিধানসভা ভোটের আগের দিন পর্যন্ত দফায় দফায় অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, রাজ্যে মোট ২৭ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। নাম বাদ পড়া এবং অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে গঠিত ১৯টি অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে মোট ৩৮ লক্ষ ২০ হাজার ৬৮৩টি আপিল জমা পড়ে। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র ১ লক্ষ ২ হাজার ২৩১টি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং এখনও ৩৭ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৫২টি আপিল অমীমাংসিত অবস্থায় ঝুলে রয়েছে। পুরসভা ও স্থানীয় ভোটের মুখে ১৯টি ট্রাইব্যুনালের মধ্যে অন্তত তিনটি ফাঁকা পড়ে রয়েছে এবং গত দুমাসে ট্রাইব্যুনালের একাধিক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিও অভিযোগ তুলেছেন যে, ইসিনেট পোর্টালের কারিগরি জটিলতা ও ব্যাকএন্ড সমস্যার কারণে তাঁদের দৈনন্দিন বিচারপ্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।