হকার কি দৃশ্য দূষণ, নাকি রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাঙ্ক? এক দশকের হাইকোর্টের ইতিহাস কি বলছে?

এক দশকে আটজন প্রধান বিচারপতি অবসর নিয়েছেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের হকার উচ্ছেদ নিয়ে নির্দেশ আজও কার্যকর করে উঠতে পারেনি বিগত রাজ্য সরকার। অবৈধ হকার উচ্ছেদ নিয়ে তৃণমূল সরকার  সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে পাত্তাই দেয়নি। এক দশকে একাধিক জনস্বার্থ মামলা হলেও সরকার চোখ খোলেনি। হকার উচ্ছেদ নিয়ে বারবার খবরের শিরোনামে উঠে আসছে।

রাজ্যের পালাবদল হয়েছে আর তারই সঙ্গে শুরু হয়েছে জোর কদমে বেআইনি হকার উচ্ছেদ যা নিয়েই বঙ্গ রাজনীতির সরগরম। হকার সমস্যা এক-দু বছরের নয় দশকের পর দশম ধরে চলছে এই সমস্যা । তিলোত্তমার ফুটপাত তৈরি হয়েছিল সাধারণ পথ চলতি মানুষের জন্য। কিন্তু সেই ফুটপাত আজ সম্পূর্ণ চলে গিয়েছে হকারদের দখলে। মানুষ বিপদ হাতে করে  ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তায় চলাচল করে।  প্রশাসন থেকে পুরসভা  এ বিষয় নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র হেল দোল ছিল না।

রাজ্যের পালাবদলের পর থেকেই জোড় কদমে চলছে বেআইনি জবরদখল করে রাখা হকার উচ্ছেদ যা নিয়ে ইতিমধ্যেই সরাসরি আঙুল তুলেছে শাসকের বিরুদ্ধে। পালা বদল কেন তার আগে থেকেই তো হকার উচ্ছেদ হওয়ার দরকার ছিল এমনটা অনেকেই মনে করছেন। তবে এ বিষয়ে রাজ্যের শীর্ষ আদালত কি নির্দেশ দিয়েছিল বিগত বছরের পর বছর ধরে তা কতটাই বা মানা হয়েছিল এবং কতটাই বা সেই নির্দেশ অমান্য করা হয়েছিল।


মহানগরীর বুকে একের পর এক হকার যত্রতত্র তারা বসে গিয়েছেন কিন্তু তাদের সরিয়ে দেওয়া  তো দূরের কথা সরকার বা প্রশাসন কেউই সেভাবে উদ্যোগ নেয়নি। কারণ সমস্তটাই ছিল ভোট ব্যাংকের রাজনীতি। ২০১৭ সালে প্রথম কলকাতা হাইকোর্টে এই অবৈধ হকার নিয়ে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছিলেন অক্ষয় কুমার সারেঙ্গী।

জনস্বার্থ মামলার আইনজীবী শ্রীকান্ত দত্ত তিনি জানিয়েছেন,হকার সমস্যা দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে একটি আইন তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আইন ভারতবর্ষের প্রতিটা রাজ্যকেই মেনে চলতে হবে এমনও নির্দেশে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মতো কেন্দ্রীয় সরকার একটি আইন তৈরি করেছিল। যেখানে হকারদের পুনর্বাসন, সচিত্র পরিচয় পত্র এবং নির্দিষ্ট স্থানে তারা যাতে তাদের পসরা নিয়ে বসেন সুপ্রিম কোর্ট তা স্পষ্ট করে দিয়েছিল।। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টে এও বলেছিল প্রতিটা রাজ্য টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠন করবে। সেখানে হকাররা বসবে সেটা ‘টাউন ভেন্ডিং জন’ হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে।

মামলাকারীর অভিযোগ তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সেই নির্দেশ মানেনি। ২০১৭ সালের তৎকালীন কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিশীতা পাত্রে এবং বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী ডিভিশন বেঞ্চে মামলার শুনানিতে রাজ্য সরকার জানিয়েছিল নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম না থাকায় বিশেষ কিছু ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। তবে ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানালেও কার্যক্ষেত্রে তা আর হয়ে ওঠেনি।

২০১৮ সালে ফের কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। যেখানে রাজ্য সরকার কলকাতা পুরসভা কেউই কেন্দ্রীয় আইন বলবৎ করেনি বলে অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলার শুনানি পর্বে রাজ্য সরকারের তরফে আইনজীবীরা জানান বিধানসভায় বিল আনা হয়েছে। এবং তা পাশও করা হয়েছে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে কতটা কার্যকর করা হয়েছিল তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল ডিভিশন বেঞ্চ।

রাজ্য সরকারের একটি বিল তারা বিধানসভায় এনেছিল যার নাম বেঙ্গল আর্বান স্ট্রিট ভেন্ডরস (প্রটেকশন অব লাইভলিহুড অ্যান্ড রেগুলেশন অব স্ট্রিট ভেন্ডিং) রুলস, ২০১৮ [West Bengal Urban Street Vendors (Protection of Livelihood and Regulation of Street Vending) Rules, 2018] । আইন করেই তা আর কার্যকর করা হয়নি বলে অভিযোগ ছিল মামলায়।

২০২১ সালে ফের কলকাতা হাইকোর্টে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম ও বিচারপতি হিরণময় ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন ‘সরকার এবং কলকাতা পুরসভা কোনোভাবেই যাতে এই মামলাটিকে সাধারণ মামলা হিসেবে ধরে না নেন, মামলাটির গুরুত্ব বিচার করতে হবে। কারণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আইনটি তৈরি করা হয়েছে’।

২০২৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে তৎকালীন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম বিস্ময় প্রকাশ করে জানায় কলকাতা পুরসভার হেড অফিসের সামনে হকারদের দখলদারি পুরো ফাঁকা করে দিতে হবে। কিন্তু সেই নির্দেশও মানেনি  তৃণমূল কংগ্রেসের পুরো বোর্ড এবং মেয়র। ২০২৫ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৌমেন সেন এবং বিচারপতি স্মিতা দাসদের ডিভিশন বেঞ্চ তৎকালীন রাজ্য সরকার এবং কলকাতা পুরসভাকে তীব্র ভৎসনা করেন।

কারণ রাজ্য সরকার যে রিপোর্ট দিয়েছিল সেই রিপোর্টে কোথাও কিছু উল্লেখ নেই। কোথায় কতজন হকারকে তারা উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য করেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন কলকাতা পুরসভার সামনে আজও হকারের রমরমা। তাদের উচ্ছেদ করতে পারেনি কলকাতা পুরসভা। এই মামলায় রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবকেও তলব করে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন বিচারপতি সৌমেন সেনের ডিভিশন বেঞ্চ।

সর্বশেষ ২০২৫ সালে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি মিতা দাসের ডিভিশন বেঞ্চ আক্ষেপের সুরে জানিয়েছিল সরকারের সদিচ্ছা না থাকলে হকার কোনোভাবেই তোলা সম্ভব হবে না। কলকাতা পুরসভার সামনে বসে থাকা হকারদের উচ্ছেদ করতে পারছে না, সারা রাজ্যে কীভাবে হকার উচ্ছেদ করবে সরকার এবং প্রশাসন?