একসময় বীরভূমে তাঁর কথাই ছিল শেষ কথা। পুলিশকে হুমকি, বিরোধীদের ধমক, প্রকাশ্য সভায় দলীয় নেতাদের ভর্ৎসনা—‘দোর্দণ্ডপ্রতাপ’ অনুব্রত মণ্ডলের দাপটের সাক্ষী থেকেছে বীরভূমের রাজনীতি। কখনও ‘গুড়-বাতাসা’, কখনও ‘চড়াম-চড়াম’ মন্তব্যে তিনি শিরোনামে থেকেছেন। তাঁর আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি বিরোধী নেতারা, এমনকি কবি শঙ্খ ঘোষও। সেই অনুব্রতকেই এবার নিজের কার্যালয়ে বসে দেখতে হল ভাঙচুর। পাঞ্জাবির কলার ধরে তাঁকে শাসানো হল। মুখে হাসি ধরে রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন একদা দাপুটে এই নেতা।
বুধবার সিউড়িতে তৃণমূলের বীরভূম জেলা কার্যালয়ের দোতলায় হামলার ঘটনা ঘটে। বর্তমানে ঋতব্রত তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত তখন ঘরেই ছিলেন। অভিযোগ, দুই যুবক ঘরে ঢুকে তাঁকে চেয়ারে বসিয়ে রেখেই ভাঙচুর শুরু করেন। চেয়ার-টেবিল থেকে বাতানুকূল যন্ত্র—কিছুই বাদ যায়নি। টেবিলের কাচ ভেঙে ছিটকে অনুব্রতের মুখেও লাগে।
স্থানীয় সূত্রে খবর, কয়েক জন যুবক গাছের ডাল ও লাঠি হাতে কার্যালয়ে ঢোকেন। তাঁদের অভিযোগ, গত ১৫ বছরে বীরভূমের মানুষের উপর ‘অত্যাচার’ করেছেন অনুব্রত। তাঁকে ‘গরুচোর’ বলেও কটাক্ষ করা হয়। অনুব্রত তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করলেও কোনও কথাই শোনেননি হামলাকারীরা।
ঘটনার একটি ভিডিয়োয় অনুব্রতকে বলতে শোনা যায়, ‘‘আমার একটা কথা শোন।’’ জবাবে এক যুবক বলেন, ‘‘আর একটা কথাও না। ১৫ বছর কত ডায়লগ দিয়েছ, কত অত্যাচার!’’ এর পরই তাঁর সামনের টেবিলে গাছের ডাল দিয়ে আঘাত করা হয়। কাচ ছিটকে অনুব্রতের গায়ে লাগে। তবু মুখে হাসি রেখেই বসে থাকতে দেখা যায় তাঁকে।
এর পরও চলতে থাকে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়। এক যুবক প্রশ্ন করেন, ‘‘লোকগুলোকে কেন মেরে এসেছিলে?’’ অনুব্রতের জবাব, ‘‘কাকে মেরেছি বলো।’’ পাল্টা বলা হয়, ‘‘দেখাব? দেখাব কাকে কাকে মেরেছেন।’’ পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে এক হামলাকারী হুমকি দেন, ‘‘এখান থেকে আর বেরোতে দেব না। খুন করলে তো একবারে শেষ।’’ অনুব্রত বার বার হাত নেড়ে তাঁদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে কার্যালয়ের আসবাবপত্র ভাঙচুর চলতেই থাকে।
কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। দুই যুবককে নিরস্ত্র করে কার্যালয় থেকে বার করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাইরে তাঁদের আরও কয়েক জন সঙ্গী ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘‘এত অত্যাচার করেছে, একে ছেড়ে দেব?’’ তবে হামলাকারীরা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সমর্থক কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ঘটনার পরে দুই তৃণমূলই হামলার নিন্দা করেছে। গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা তথা বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘আমাদের নেতা অনুব্রত মণ্ডলের উপরে যে ভাবে হামলা হয়েছে, তার নিন্দার ভাষা নেই।’’ তাঁর দাবি, সরকার বদলের পর আইনের শাসনের কথা বলা হলেও এই ঘটনা তার বিপরীত ছবি দেখাল। প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার কথাও জানান তিনি।
অন্য দিকে, মমতা তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষও পর পর কয়েক দিন অনুব্রতের উপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনা সমাজ এবং আইনশৃঙ্খলা—দুইয়ের পক্ষেই ক্ষতিকর। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য হামলার সঙ্গে দলের কোনও যোগ নেই বলে বিবৃতি দেবেন—এমন কটাক্ষও করেন তিনি।
পাল্টা বিজেপি বিধায়ক ধ্রুব সাহা বলেন, অনুব্রত একসময় নিজেই বলেছিলেন, ‘‘সেই ফুটুনি কি আমার আর আছে!’’ তাঁর দাবি, ‘‘ফুটুনি থাকে জনতা-জনার্দনের হাতে।’’ অনুব্রতের বিরুদ্ধে অতীতে অত্যাচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ক্ষোভ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনও ভাবেই কাম্য নয়। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা অত্যাচারিত হয়েছেন, তাঁদের আইনের উপর ভরসা রাখা উচিত।’’
হামলার পর দুই অনুগামীর কাঁধে ভর দিয়ে কার্যালয় থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠেন অনুব্রত। তিনি আহত কি না, তা স্পষ্ট নয়। সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে অবশ্য রাজনৈতিক মন্তব্য এড়িয়ে শুধু বলেন, ‘‘তোমাদের ভালবাসি।’’