বিধানসভা ভোটের আগে ফের একবার রাজ্যে এসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। শনিবার প্রথমে ব্যারাকপুরে সভা করেন তিনি। সেখান থেকে আনন্দুপুরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে সরব হন তিনি। কাঠগড়ায় দাঁড় করান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। গত ২৫ জানুয়ারি গভীর রাতে আনন্দুপুরে ডেকরেটরের গুদামে এবং ‘ওয়াও মোমো’ করাখানার গুদামে আগুন লাগে।
তাতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন অমিত শাহ। মোমো কোম্পানির মালিককে এখনও কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কোম্পানির মালিকের সঙ্গে কার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে তা নিয়েও সওয়াল করেন শাহ। ব্যারাকপুরে বিজেপির কর্মী সভা থেকে শাহের তোপ, ‘মমতাজি, আপনার লজ্জা হওয়া উচিত!’ পাল্টা নিশানা করেছে তৃণমূল। গুজরাতে ‘ট্রিপল ইঞ্জিন’ সরকার চলা সত্ত্বেও কেন একের পর এক সেতু ভেঙে পড়ে, সে সবের নেপথ্যে ‘ঈশ্বরের হাত’ না কি ‘জালিয়াতি’, সে প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল।
আনন্দপুরের ঘটনায় ‘মৃত শ্রমিকদের’ প্রতি ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ জানিয়ে ব্যারাকপুরের সভা শুরু করেন বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ। আনন্দপুরের অগ্নিকাণ্ড কোনও ‘দুর্ঘটনা’ নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ‘দুর্নীতির ফল’ বলে তখনই মন্তব্য করেন তিনি। গত কয়েক দিন ধরেই আনন্দপুর নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক, বিক্ষোভ এবং ভাষণ দিতে দেখা যায় শুভেন্দু অধিকারী এবং শমীক ভট্টাচার্যদের।
শাহ তাঁর ভাষণে বলেন, ‘আনন্দপুরে মোমো কারখানার গুদামে অগ্নিকাণ্ডের জেরে ২৫ জনের প্রাণ গিয়েছে, ২৭ জন নিখোঁজ।’ শাহের প্রশ্ন, ‘এই ঘটনা কেন হল? এই মোমো কারখানার মালিকের কাছে কার পয়সা খাটছে? এই মোমো কারখানার মালিক কার ঘনিষ্ঠ? কার সঙ্গে বিমানে বিদেশ সফরে গিয়েছেন? এখনও পর্যন্ত মোমো কারখানার মালিককে গ্রেপ্তার করা হল না কেন?’ এই রকম একাধিক প্রশ্ন তোলেন শাহ।
মমতার উদ্দেশে শাহের প্রশ্ন, ‘আমি মমতাজিকে জিজ্ঞাসা করতে চাই, এই ঘটনা যদি অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে ঘটত, তা হলেও আপনার প্রতিক্রিয়া কি এ রকমই হত?’ শাহের নিশানা, ‘পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকদের মৃত্যু হয়েছে। এতেও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করছেন। আপনার লজ্জা হওয়া উচিত।’
এর পরেই সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, ‘আমি মমতাজিকে বলতে চাই, ধামাচাপা দিতে চাইলে দিন। কিন্তু এপ্রিলের পরে বিজেপি সরকার আসবে আর এই ঘটনার জন্য যারা দায়ী, তাদের খুঁজে খুঁজে জেলে পাঠানো হবে।’ বাংলার প্রশাসন শেষ হয়ে গিয়েছে বলেও শাহ মন্তব্য করেছেন।
ব্যারাকপুরে শাহের কর্মসূচি মিটতেই পাল্টা আক্রমণে নামে তৃণমূল। দলের সমাজমাধ্যমে লেখা হয়, ‘গুজরাতে ট্রিপল ইঞ্জিন সরকার চলছে। রাজ্যে বিজেপি। কেন্দ্রে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উভয়েই গুজরাতের। তার পরেও সেতু ভেঙে পড়া এবং পরিকাঠামোগত বিপর্যয় রুটিন হয়ে উঠেছে, যাতে শয়ে শয়ে নিরীহ প্রাণ যাচ্ছে। এখন সেই অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। সম্ভবত তিনি ব্যাখ্যা দিতে পারবেন যে, গুজরাতের ওই সব বিপর্যয়ের নেপথ্যে ঈশ্বরের হাত রয়েছে না কি জালিয়াতি রয়েছে।’
অনুপ্রবেশ, দুর্নীতি, অপশাসন, নারী সুরক্ষার অভাব এবং পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে আঘাত করা হচ্ছে বলে তৃণমূলকে নিশানা করেন তিনি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য তৃণমূলের সরকার জমি দিচ্ছে না বলে শাহ ফের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হাইকোর্ট মেনে নিয়েছে যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমি দিচ্ছেন না। অনুপ্রবেশ রোখার কোনও আগ্রহ তাঁর নেই।’
তার পরেই শাহের মন্তব্য, ‘আপনারা ভাববেন না যে, হাইকোর্টের নির্দেশের পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমি দিয়ে দেবেন। উনি দেবেন না। কারণ, অনুপ্রবেশকারীরাই তাঁর ভোটব্যাঙ্ক।’ শাহের প্রতিশ্রুতি, ‘আমি কথা দিচ্ছি, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে তিনি জমি দিন বা না-দিন, এপ্রিলের শেষে বিজেপির সরকার হওয়ার পরে ৪৫ দিনের মধ্যে সে কাজ করে দেব।’
অনুপ্রবেশ প্রশ্নেও শাহকে পাল্টা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে তৃণমূল। রাজ্যের শাসকদলের প্রশ্ন, ‘অনুপ্রবেশ যদি ঘটে থাকে, তা হলে সে ব্যর্থতা কার? বিএসএফ, সিআরপিএফ এবং সিআইএসএফ হাতে থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার কেন ভারতের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে?’ তৃণমূলের প্রশ্ন, অনুপ্রবেশ যদি শুধু পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক সমস্যা হত, তা হলে সন্ত্রাসবাদীরা পহেলগাঁওয়ে ঢুকে ২৬ জনের প্রাণ নিল কী ভাবে?
চলতি বছর বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন এবার বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপিই। বারাকপুরের সভা থেকে বিজেপি কর্মীদের টার্গেট বেঁধে দেন অমিত শাহ। বাংলায় এবার ৪৫ শতাংশের বেশি ভোট বিজেপিকে পেতে হবে। এবার ৫০ শতাংশ আসন বিজেপি রাজ্যে পাবে। মমতার সরকারের পতন হবে বলে সুর চড়ান তিনি।
অমিত শাহের অভিযোগের পাল্টা তৃণমূলের সমাজমাধ্যমে ইনচার্জ দেবাংশু ভট্টাচার্য এ দিন এক সংবাদ মাধ্যমে বলেন, ‘রাজ্য সরকার গোটা ঘটনার তদন্ত করছে। এখানে প্রশাসন পুরো বিষয়টি শক্ত হাতে দেখছে। যে বা যারা দোষী, তারা শাস্তি পাবে।’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তোলা সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি তৃণমূল নেতা ঋজু দত্ত বলেন, ‘আনন্দপুরের ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
আমরা দুঃখিত। সঠিক তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অমিত শাহ দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন মণিপুরে বহু মানুষ ঘরছাড়া। ১০ হাজার, ১৫ হাজার মানুষের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন রাজধানীতে বিস্ফোরণ হয়েছে। লজ্জা থাকলে তিনি পদত্যাগ করুন।’
বঙ্গে ক্ষমতা দখলের জন্য যে বিজেপি এক ইঞ্চিও জায়গা ছাড়বে না, এ দিন তা স্পষ্ট ভাবে বুঝিয়ে দেন অমিত শাহ। শনিবার ব্যারাকপুর থেকে ফের একবার বাঙালি অস্মিতায় শাণ দেন তিনি। শাহ বলেন, ‘এই মুহূর্তে ২১টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। কিন্তু তা নিয়ে সন্তুষ্ট নই। নরেন্দ্র মোদী এবং দলের কর্মীরা স্বস্তি পাবেন, যখন বাংলাকে নিয়ে সংখ্যাটা ২২ হয়ে যাবে।’
এ দিন মতুয়া, নমঃশূদ্রদের আশ্বাস দেন অমিত শাহ। তৃণমূল তাঁদের ভয় দেখাচ্ছে। তা জানিয়ে শান্তনু ঠাকুর তাঁকে ফোন করেছেন বলে এদিন জানান তিনি। এর পরেই অমিত শাহ বলেন, ‘মতুয়া, নমঃশূদ্রদের ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। তাঁদের ভোট কেউ ছুঁতেও পারবে না।’ রাজ্যে এসআইআর চলাকালীন শাহের এই বার্তা অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। এসআইআর প্রসঙ্গে শাহ বলেন, ‘বাংলার ভোটার তালিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের ছাঁটাই করার প্রয়োজন রয়েছে।’