তারাতলা বিপর্যয়ে ফিরহাদ হাকিমের গ্রেপ্তারির দাবিতে সরব সব পক্ষ

ফিরহাদ হাকিম। ফাইল চিত্র।

তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ধসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর ক্রমেই চাপে পড়ছেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৫ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। আর এই মর্মান্তিক ঘটনার পরই গুদামের নকশায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সরব হয়েছে রাজনৈতিক মহল। শুধু কংগ্রেস বা বামেদের মতো বিরোধীরাই নয়, শাসকদল বিজেপির একাংশও তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং গ্রেপ্তারির দাবি তুলেছে। একই দাবি তুলেছে কালীঘাট তৃণমূলও। বিধানসভায় খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় ত্রুটি ছিল। ত্রুটিপূর্ণ সেই নকশায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। মুখ্যমন্ত্রীর ওই মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বেড়েছে বিতর্ক।

সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫-এর ২০ নভেম্বর মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকে ওই গুদামের নকশা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছিল, গুদামের নকশায় সরাসরি বিল্ডিং রুল ভাঙা না হলেও বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে সেই ছাড় কার্যকর করার আগে বিল্ডিং বিভাগের মেয়র পারিষদ অথবা মেয়রের অনুমোদন প্রয়োজন। পুরসভার নথিতে দেখা যাচ্ছে, সেই অনুমোদনে সই করেছিলেন ফিরহাদ হাকিম। সে সময় ফিরহাদ মেয়র এবং বিল্ডিং বিভাগেরও দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।

জানা গিয়েছে, তারাতলায় ভেঙে পড়া গুদাম নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন আসগর হোসেন। এই আসগরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকা বা ৮০ ওয়ার্ডের সদ্য প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর আনোয়ার খানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে অভিযোগ। আসগর এবং আনোয়ার দু’জনের সঙ্গেই ফিরহাদের ঘনিষ্ঠতার বিভিন্ন ছবি ও তথ্য সামনে এসেছে। যা এই ঘটনার তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। যদিও নিজের দায় ঝেড়ে ফেলেছেন তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তাঁর দাবি, গুদামটি বেআইনি ছিল না। নজরদারির অভাবই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ প্রসঙ্গে তাঁর সাফ কথা, ‘মেয়র বা কমিশনার গিয়ে প্রতিটি নির্মাণকাজ তদারকি করতে পারেন না। আমি নিজেও কোনও বিশেষজ্ঞ নই। মিটিং নোটে সই করা ছিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ মাত্র।’


কিন্তু তাঁর এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কালীঘাট তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ সরাসরি ফিরহাদকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ সাংসদ মহুয়া মৈত্র প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ হলে ফিরহাদের ক্ষেত্রে আলাদা আচরণ কেন? বাম নেতা সুজন চক্রবর্তীর প্রশ্ন, সরকারপন্থী বিরোধী দলে থাকার কারণেই কি প্রাক্তন মেয়রের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

তবে প্রাক্তন মেয়রকে সুরক্ষা দেওয়ার দাবি মানতে নারাজ বিজেপি। শাসক দলের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যখন বিধানসভায় নথি দেখিয়ে ফিরহাদের নাম উল্লেখ করেছেন, তখন তাঁকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা কীভাবে আসছে। যদিও কালীঘাট শিবিরের একাংশের মতে, ফিরহাদকে সুরক্ষা দেওয়ার পিছনে একাধিক রাজনৈতিক সমীকরণ রয়েছে। তাঁদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের কয়েকজন নেতা রাজনৈতিক নিরাপত্তার খোঁজে বিজেপি শিবিরের দিকে ঝুঁকছেন। এই পরিস্থিতিতে ফিরহাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ হলে সেই সমীকরণে প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, ফিরহাদের মেয়ে প্রিয়দর্শিনী হাকিম ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতার কাউন্টিং এজেন্ট ছিলেন। ওই কেন্দ্রের ফলাফল নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ওই মামলায় প্রিয়দর্শিনী গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হতে পারেন। ফলে গোটা ঘটনাকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিজেপির একাংশ মনে করছেন, ফিরহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ‘সেটিং’-এর অভিযোগ আরও জোরাল হবে। তবে রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্টই জানিয়েছেন, তদন্তে কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ মিললে তিনি পার পাবেন না।