মুর্শিদাবাদের বেলডাঙার পরিযায়ী যুবক আলাউদ্দিন শেখের রহস্যমৃত্যু ঘিরে উত্তাল বাংলা। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু রাজ্য নয়, আন্তঃরাজ্য স্তরেও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকের ‘খুন’-এর ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম শাস্তির দাবি জানিয়ে ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেনকে সরাসরি ফোন করলেন সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুক্রবার দুপুরে ফোনালাপে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানান, বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা কোনওভাবেই খাটো করে দেখা যাবে না। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়ে বলেন, দোষীরা যেন আইনের ফাঁক গলে বেরোতে না পারে—সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সরেন আশ্বাস দেন, ইতিমধ্যেই পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে এবং গোটা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
নিহত আলাউদ্দিন শেখ মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা থানার কুমারপুর পঞ্চায়েতের সুজাপুর তালপাড়ার বাসিন্দা। প্রায় পাঁচ বছর আগে জীবিকার সন্ধানে ঝাড়খণ্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। সেখানকার বিভিন্ন গ্রামে ফেরিওয়ালার কাজ করতেন। পরিবারের দাবি, কাজের সূত্রে একাধিকবার হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন আলাউদ্দিন। তাঁকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল তাঁর। বৃহস্পতিবার বিকেলেও ফোনে কথা হয়। তারপর আচমকাই মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। শুক্রবার সকালে বাড়িতে আসে মৃত্যুর খবর। ঘরের ভিতর থেকে উদ্ধার হয় তাঁর ঝুলন্ত দেহ।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই বেলডাঙায় দাবানলের মতো ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিবার-পরিজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তায় নামেন। বেলডাঙা স্টেশনে ট্রেন আটকে দেওয়া হয়, যার জেরে শিয়ালদহ-লালগোলা শাখায় রেল চলাচল ব্যাহত হয়। পাশাপাশি ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ হওয়ায় কলকাতা ও উত্তরবঙ্গগামী যান চলাচল কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি শান্তি বজায় রাখার আবেদন জানান এবং প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে জেলা প্রশাসনের আশ্বাসে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। নিহত যুবকের পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি এবং আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
তবে রাজনৈতিক স্তরে এই ঘটনার সবচেয়ে জোরালো প্রতিক্রিয়া এসেছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নে তিনি বারবার কেন্দ্র ও বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। বেলডাঙার এই ঘটনায়ও তাঁর স্পষ্ট অবস্থান—এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরিযায়ী বাঙালিদের উপর লাগাতার নির্যাতনের প্রতিফলন। দোষীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি তিনি নজরে রাখবেন বলেও ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছেন।
এই মুহূর্তে ঝাড়খণ্ড পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে নিহত আলাউদ্দিন শেখের পরিবার ও গোটা বেলডাঙা। পাশাপাশি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপে আন্তঃরাজ্য স্তরে এই ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।