ভোটের পর গ্যাসের দাম ২০০০ টাকা হয়ে যাওয়ার সতর্কবার্তা অভিষেকের

কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঝাঁজ আরও বাড়ালেন তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ঝাড়গ্রামের বিনপুরে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী বীরবাহা হাঁসদার সমর্থনে আয়োজিত জনসভা থেকে তিনি সরাসরি অভিযোগ তুললেন, ‘বিজেপি সংবিধান পাল্টানোর চেষ্টা করছে।’ পাশাপাশি ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা— ‘ধর্ম নয়, কর্মে ভোট দিন।’

শুক্রবারের এই জনসভায় অভিষেকের বক্তব্য জুড়ে ছিল একাধিক জাতীয় ও রাজ্যস্তরের ইস্যু। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি দাবি করেন, তার প্রভাব ইতিমধ্যেই ভারতের জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। রান্নার গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এখানেই থেমে না থেকে তিনি সতর্কবার্তা দেন, ‘বাংলার নির্বাচন মিটলেই কেন্দ্রীয় সরকার রান্নার গ্যাসের দাম ২ হাজার টাকা করে দেবে। পেট্রল-ডিজেলের দামও ২০০ টাকায় পৌঁছে যাবে।’

এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও বিজেপির তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তৃণমূল শিবিরের দাবি, সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ বাড়ানোর দিকেই এগোচ্ছে কেন্দ্র।


অভিষেক তাঁর ভাষণে উন্নয়নকেও সামনে নিয়ে আসেন। তিনি জানান, বিনপুর বিধানসভা এলাকায় শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দশটিরও বেশি স্কুলে অলচিকি ও বাংলা ভাষায় পাঠদান চালু হয়েছে। পাশাপাশি বেলপাহাড়ী গ্রামীণ হাসপাতালে আধুনিক সিজারিয়ান ইউনিট গড়ে তোলা হয়েছে, যার ফলে গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবা আরও শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া এলাকায় একাধিক সেতু নির্মাণের কথাও তুলে ধরেন তিনি, যা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করেছে।

বিজেপি প্রার্থীকে কটাক্ষ করতে গিয়েও কড়া ভাষা ব্যবহার করেন অভিষেক। তাঁর দাবি, ওই প্রার্থীর সঙ্গে বিনপুরের কোনও যোগ নেই। অতীতে ভোটে পরাজিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। ‘বারবার ফেল করা ছাত্রকে স্কুলও আর সুযোগ দেয় না’— এই মন্তব্য করে তিনি প্রার্থী নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

সংবিধান পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরোধিতাও করেন। তাঁর মতে, এই আইন কার্যকর হলে তপশিলি জনজাতির মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কেন্দ্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনযাপনেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অভিষেক তাঁর বক্তব্যে অতীতের জঙ্গলমহলের পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০১১ সালের আগে এই অঞ্চলে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন। বর্তমান রাজ্য সরকারই সেখানে শান্তি ও উন্নয়ন ফিরিয়ে এনেছে বলে দাবি করেন তিনি। এরপর পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাট ও পাঁশকুড়ায় জনসভা করে একই সুরে কেন্দ্রকে আক্রমণ করেন অভিষেক। কোলাঘাটে তৃণমূল প্রার্থী অসীম কুমার মাজীর সমর্থনে প্রচার করতে গিয়ে তিনি স্থানীয় উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেন। রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পরিকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পলিটেকনিক কলেজ স্থাপনের কথাও উল্লেখ করেন।

সবচেয়ে বড় ঘোষণা হিসাবে তিনি ফুলচাষিদের জন্য কোল্ড স্টোরেজ তৈরির প্রতিশ্রুতি দেন। জানান, রাজ্য বাজেটে ৫০টি নতুন কোল্ড স্টোরেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষমতায় এলে পাঁশকুড়া ও সংলগ্ন এলাকায় দ্রুত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এছাড়া রূপনারায়ণ নদীর বাঁধ সংস্কারের কাজ ছয় মাসের মধ্যে শুরু করার আশ্বাসও দেন তিনি।

কোলাঘাটের সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন মন্ত্রী সৌমেন মহাপাত্র। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে ঘিরে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, এই উপস্থিতি সেই দূরত্ব অনেকটাই কমিয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। মঞ্চে উঠে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবরও নেন অভিষেক, যা নজর কেড়েছে উপস্থিত জনতার।

এদিন অভিষেক আরও অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলার মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ বা ‘রোহিঙ্গা’ বলে অপমান করা হচ্ছে। এই ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে ভোটের মাধ্যমে জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে তৃণমূলকে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন।

সবশেষে তিনি স্পষ্ট করে দেন, ‘এই নির্বাচন শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই।’ তাঁর কথায়, যেখানে বিজেপি বিভাজনের রাজনীতি করছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস উন্নয়ন ও মানবিকতার পথেই এগোচ্ছে।