কোনও ব্যক্তি যেখানে থাকেন, তার প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে আধার কার্ড গ্রহণযোগ্য বলে পর্যবেক্ষণ করল কলকাতা হাইকোর্ট। তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, আধার কার্ড কোনওভাবেই চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। বেআইনি দখলদারি সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে মঙ্গলবার এই রায় দেন বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি সুপ্রতিম ভট্টাচার্যের ডিভিশন বেঞ্চ।
রায়ে আদালত জানিয়েছে, আধার কার্ডের জন্য আবেদন করার সময় ঠিকানার তথ্য যাচাই করা হয়। সেই কারণে কোনও ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস করছেন, এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রাথমিক নথি হিসেবে আধার কার্ডকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা যায় না। একই সঙ্গে আদালত জানিয়েছে, ভোটার কার্ড, গ্যাসের বিল-সহ অন্যান্য সরকারি নথিও কোনও ব্যক্তির বাসস্থানের প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে প্রাথমিক প্রমাণ এবং চূড়ান্ত প্রমাণ এক নয় বলেও ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে। আদালতের মতে, সরকারি নথিগুলির প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে গুরুত্ব থাকলেও সেগুলি কোনওটিরই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকার আগেই জানিয়েছে, আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। সুপ্রিম কোর্টও একাধিক রায়ে বলেছে, আধার আইন অনুযায়ী এটি নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র নয় বরং কেবলমাত্র একটি পরিচয়পত্র। যদিও বহু মানুষ বসবাসের ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে আধার ব্যবহার করেন, সেই বিষয়টি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই কলকাতা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ক্যালকাটা ডক লেবার বোর্ড এবং ক্যালকাটা পোর্ট ট্রাস্টের আবাসন নিয়ে একটি মামলা হয়। বেআইনি দখলের অভিযোগ তুলে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট কর্তৃপক্ষ ৫০০টিরও বেশি আবাসিক কোয়ার্টার ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই কোয়ার্টারগুলিতে প্রায় ৮ হাজার মানুষ থাকেন। বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনও নোটিস বা শুনানির সুযোগ না দিয়েই উচ্ছেদ এবং ভাঙার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর আগে হাইকোর্টের একক বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করেছিল, বাসিন্দারা কীভাবে ওই কোয়ার্টারগুলিতে থাকছিলেন, তার স্পষ্ট কোনও প্রমাণ নেই। শুধু আধার কার্ড বা ভোটার কার্ডের ভিত্তিতে তাঁদের বৈধ বাসিন্দা বলা যায় না। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করেই বাসিন্দারা ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হন। তাঁদের দাবি, তাঁরা বহু বছর ধরে ওই এলাকায় থাকেন। তাই তাঁদের বক্তব্য না শুনে উচ্ছেদ বা বাড়ি ভেঙে দেওয়া আইনসম্মত নয়।
অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয় যে, শুধু আধার বা ভোটার কার্ড দেখিয়ে কোনও ব্যক্তি ওই এলাকায় বসবাসের বৈধ অধিকার দাবি করতে পারেন না। তাদের দাবি সংশ্লিষ্ট বাসিন্দারা অবৈধভাবে ওই আবাসনগুলিতে আছেন।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে, বাসিন্দাদের কাছে থাকা সরকারি নথি থেকে অন্তত এটুকু বোঝা যায় যে তাঁরা ওই এলাকায় থাকেন। তাই তাঁদের অবৈধ দখলদারি হিসেবে ঘোষণা করার আগে আইন অনুযায়ী যথাযথ তদন্ত করা আবশ্যক। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, কেন তাঁদের অবৈধ দখলদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং কেন উচ্ছেদ করা হবে, সেই কারণ দেখিয়ে প্রত্যেক পরিবারকে পৃথকভাব নোটিস দিতে হবে।
সেই সঙ্গে তাঁদের বক্তব্য শোনার সুযোগ দিতে হবে এবং নিজেদের পক্ষে প্রমাণ ও যুক্তি দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সব দিক খতিয়ে দেখার পরেই উচ্ছেদ বা আবাসন ভাঙার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেছে, বন্দর কর্তৃপক্ষের কোনও ভবন ভেঙে ফেলার ক্ষমতা নেই। এ ধরনের পদক্ষেপ কেবলমাত্র উপযুক্ত কর্তৃপক্ষই করতে পারে।