জনমুখী বাজেট: উন্নয়নের ধারায় নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত

Image: ANI

২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের বাজেট রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক রূপরেখা হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন সরকারের এই বাজেটে একদিকে যেমন সরকারি কর্মীদের জন্য বড়সড় ডিএ বৃদ্ধি ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনই কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, এই বাজেটকে একটি জনমুখী এবং উন্নয়নমুখী বাজেট বলেই চিহ্নিত করা যায়।
সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা নিঃসন্দেহে ডিএ বৃদ্ধি। বর্তমানে ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পাওয়া রাজ্য সরকারি কর্মী, আধা-সরকারি কর্মী এবং পেনশনভোগীদের জন্য অতিরিক্ত ২০ শতাংশ ডিএ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে মোট ডিএ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৩৮ শতাংশ। এই নতুন হার কার্যকর হবে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে ডিএ বৃদ্ধি নিয়ে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এই ঘোষণা কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাজেটে মোট ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগের কথা ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এর পাশাপাশি ৫০ হাজার শিক্ষক ও অধ্যাপক নিয়োগ এবং পুলিশে ২০ হাজার নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১.৭ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই উদ্যোগ রাজ্যের বেকার সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
শুধু সরকারি চাকরি নয়, বেকার যুবকদের জন্য ‘ভরসা কর্মসূচি’ নামে একটি নতুন প্রকল্প চালু করার কথাও বলা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী শিক্ষিত বেকারদের মাসিক ভাতা দেওয়া হবে—গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ৩,০০০ টাকা এবং অন্যদের জন্য ২,০০০ টাকা। যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ টাকার কম এবং অন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা নেই, তারা এই প্রকল্পের আওতায় আসবে। এটি সরাসরি যুবসমাজকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
সামাজিক সুরক্ষা খাতেও বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ দফতর পেয়েছে সর্বোচ্চ বরাদ্দ— ৫২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬,০০০ কোটি টাকা, যার মাধ্যমে যোগ্য মহিলারা মাসে ৩,০০০ টাকা করে পাবেন। এটি নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ।
পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ উন্নয়ন দফতর পেয়েছে ৫১,৮৩৬ কোটি টাকা এবং স্কুল শিক্ষা দফতরের জন্য বরাদ্দ ৪৪,৯৪৮.২১ কোটি টাকা। গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ঘোষণা রয়েছে। উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি, একটি আইআইএম এবং একটি এআইআইএমএস প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এককালীন ৩০,০০০ টাকা আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। মেধাবী ১০০ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কিম চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।
পরিকাঠামো উন্নয়নের দিক থেকেও এই বাজেট গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার যাত্রীচাপ কমাতে কল্যাণীর কাছে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ একর জমিতে একটি নতুন গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুরুলিয়া, মালদা ও বালুরঘাটে নতুন বিমানবন্দর তৈরির কথা বলা হয়েছে এবং কোচবিহার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হবে এবং পর্যটন শিল্পও লাভবান হবে।
শুধু বিমানবন্দর নয়, অন্যান্য পরিকাঠামোতেও বড় বরাদ্দ করা হয়েছে। ভাগীরথী নদীর উপর সেতু নির্মাণে ১,২০০ কোটি টাকা, চিংড়িঘাটা-নিউটাউন এলিভেটেড করিডরের জন্য ৯০০ কোটি টাকা এবং সুন্দরবন এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্যও ১,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে সহায়ক হতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশে ২০ হাজার নিয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি মহকুমায় মহিলা থানা, প্রতিটি থানায় নারী সহায়তা ডেস্ক এবং মহিলা পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক হিংসার শিকারদের জন্য ‘সংগ্রামী ভাতা’ চালুর কথাও বলা হয়েছে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে সরকার ‘অ্যান্টি-সিন্ডিকেট’ আইন আনার কথাও ঘোষণা করেছে। ব্যবসায়ীদের উপর অপ্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজি বন্ধ করতে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘কস্ট অফ ডুয়িং বিজনেস’ কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
মহিলাদের ক্ষমতায়নেও বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চাকরিতে সংরক্ষণ, অন্নপূর্ণা যোজনা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং ক্লাউড কিচেন পলিসির মাধ্যমে মহিলাদের ক্ষুদ্র উদ্যোগে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বহু মহিলা ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ পাবেন।
পেনশন খাতেও কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বয়স্ক, বিধবা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পেনশন ৫০০ টাকা করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া হোমগার্ড, সিভিল ডিফেন্স কর্মী ও অন্যান্য অস্থায়ী কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
পর্যটন ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিরক্ষায় একটি টেগোর কালচারাল সেন্টার তৈরি করা হবে। দুর্গাপুজোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ডিং করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি শক্তিপীঠ সার্কিট গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, প্রায় ৪.৩৮ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটটি একাধিক দিক থেকে ভারসাম্যপূর্ণ। একদিকে যেমন সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তেমনই পরিকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের দিকেও সমান জোর দেওয়া হয়েছে।
তবে এত বড় ঘোষণার বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকার বিপুল ঋণের বোঝা
মাথায় নিয়ে এই পরিকল্পনাগুলি বাস্তবায়ন করা সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে। তবুও, সামগ্রিকভাবে এই বাজেট রাজ্যের উন্নয়নকে নতুন গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং পরিকাঠামো— এই তিন স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের ‘বিকশিত বাংলা’র রূপরেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে সরকার।