‘৩৩ বছর কাটল, কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না…’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার এই বিখ্যাত পঙক্তিই যেন আজ বাংলার রাজনীতির মোড়ে পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইল। ধর্মতলার মোড়ে পুলিশের গুলিতে লুটিয়ে পড়া ১৩ শহীদের পরিবারও মঙ্গলবার সম্ভবত মনে মনে এই কথাগুলোই আউড়ালেন। হয়তো মুখে বললেন না। রাজনৈতিক অস্তিত্বরক্ষার মরিয়া তাগিদে চার ভাগে ভাগ হয়ে গেল একুশের রক্তাক্ত অভিজ্ঞান! মানুষের কৌতূহলী জটলায় প্রশ্ন, মরেও মুক্তি নেই! শহীদ তুমি কার?
তেত্রিশ বছর ধরে ২১ জুলাইয়ের রক্তাক্ত ইতিহাসের রাজপথ একটাই ছবি দেখতে অভ্যস্ত ছিল। ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে মাইক হাতে একটাই মুখ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এই বছরের চিত্রনাট্য পুরোটাই বদলে গেছে। দলীয় ভাঙন, অভ্যন্তরীণ দলাদলি আর আইনি কাঁটাতারে বিভক্ত একুশে জুলাই। একটা নয়, দুটো নয়, চার-চারটে আলাদা মঞ্চ থেকে আজ হুঙ্কার উঠছে। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো সেই ১৩ জন শহীদের আসল রক্তধারা বয়ে নিয়ে চলেছেন নাকি তাঁরাই! নাছোড় নাগরিক মনে বেয়াড়া প্রশ্ন উঠছে, তেরোটি তাজা প্রাণের আত্মত্যাগ কি তবে শেষমেশ দলীয় রাজনীতির অঙ্কে কাটাকাটি হয়ে গেল?
চার মঞ্চে স্মৃতির দাবিদার
বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর জোড়াফুল শিবির এখন একাধিক টুকরোয় বিভক্ত। কালীঘাটপন্থী মূল শিবিরের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া কড়া বিধিনিষেধের কারণে এবার আর ধর্মতলার চেনা মোড়ে পৌঁছনো সম্ভব হয়নি। সভা করতে হল বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে।
অন্যদিকে, নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী সমাবেশ করল ধর্মতলার গান্ধীমূর্তির পাদদেশে। যদিও তাদের প্রতীক ও অধিকারের লড়াই এখনও ঝুলে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের দরবারে।
তৃতীয় শিবির, অর্থাৎ তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের নিয়ে গঠিত এনসিপিআই কলকাতার ভিড়ে না থেকে দিল্লির রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীকে স্মরণ করে দিনটি পালন করল।
আর চতুর্থ দল হিসেবে ইতিহাস তুলে ধরে ময়দানে নেমেছিল কংগ্রেস। শহিদ মিনারের পাদদেশে আয়োজিত সভায় প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের বক্তব্য খুব সোজা, নিহত ১৩ জনই সেদিন ছিলেন যুব কংগ্রেসের কর্মী । ফলে এই স্মৃতির আসল দাবিদার তারাই।
এবং শুভেন্দু
এদিকে শহিদ দিবসের ঠিক প্রাক্কালে রাজ্য রাজনীতিতে বিস্ফোরণ ঘটান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভায় পেশ করেন ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের তদন্ত কমিশনের বহুপ্রতীক্ষিত রিপোর্ট। রিপোর্ট উদ্ধৃত করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, পূর্বতন সরকারের সময় গঠিত কমিশন প্রতিটি মৃত পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। অথচ আদতে দেওয়া হয়েছিল নিহতদের পরিবারকে মাত্র ২ লক্ষ টাকা আর আহতদের ১৫ হাজার টাকা!
মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট অভিযোগ, শহিদ পরিবারের রক্তকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়ে ক্ষমতার সুফল ভোগ করেছেন অনেকেই। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা করেন, বঞ্চিত পরিবারগুলি চাইলে নতুন করে এফআইআর দায়ের করতে পারে, সরকার সব রকম আইনি সাহায্য দেবে।
শহিদ পরিবারেও বিভাজন
রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের এই টানাটানির মাঝে সবচেয়ে মর্মান্তিক ছবি ধরা পড়েছে নিহত ১৩ জন শহিদের পরিবারগুলির অন্দরে। হাওড়ার এক শহিদ পরিবার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রাজপথ বা রাজনীতির সমীকরণ যতই বদলাক, তাদের আবেগের ঠিকানা আজও অপরিবর্তিত। তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মঞ্চেই উপস্থিত থেকেছেন।
কিন্তু এর ঠিক বিপরীত ছবি বরানগরের বিশ্বনাথ রায়ের পরিবারে। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা, কোনও রাজনৈতিক দলের ফায়দা তোলার মঞ্চেই তাঁরা আর পা রাখবেন না। পাশাপাশি জানা গিয়েছে, এই প্রথমবার বেশ কিছু শহিদ পরিবার কোনও আমন্ত্রণপত্রই হাতে পাননি, যা নিয়ে ক্ষোভ জমেছে অনেকের মনে।
ইতিহাস বনাম আবেগ
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই মহাকরণ অভিযানে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১৩ জন তরুণ। সেদিন যুব কংগ্রেসের সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর সেই স্মৃতি উসকেই গড়ে তোলেন শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি। ফলে কংগ্রেসের দাবি যেমন ফেলে দেওয়ার নয়, তেমনই বিগত ৩৩ বছর ধরে সাধারণ মানুষের আবেগ গড়ে তোলার কারিগর যে মমতা, তাও অনস্বীকার্য। কিন্তু আজ যখন ইতিহাস ও আবেগের মধ্যে বিভাজন ঘটে, তখন শহীদের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে ওঠে স্রেফ রাজনীতির একটি ঘুঁটি।
শহিদের রক্তের কোনও প্রতীক নেই
দিনের শেষে এটাই বলার, একুশে জুলাই নিয়ে যে চতুর্মুখী দড়ি টানাটানি প্রত্যক্ষ করা গেল, তার মূল চালিকাশক্তি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয়, বরং রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ। কালীঘাট শিবিরের কাছে এটি ছিল নিজেদের অস্তিত্ব ও ব্যাপ্তি প্রমাণের লড়াই। ঋতব্রত শিবিরের কাছে বৈধতা খোঁজার তাগিদ। বিদ্রোহী এনসিপিআই-এর কাছে দিল্লিতে বার্তা দেওয়ার তাগিদ, আর শাসক বিজেপির জন্য প্রতিপক্ষের নৈতিক ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার একটা সুবর্ণ সুযোগ।
শুভেন্দু অধিকারী যেভাবে কমিশন রিপোর্ট ও ক্ষতিপূরণের হিসাব সামনে এনেছেন, তা রাজনৈতিকভাবে যতই ধারালো হোক, তার টাইমিং নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে রাজনীতির এই হিসেবনিকেশের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে থাকে সেই তেরোটি পরিবারের ব্যক্তিগত শূন্যতা ও শোক। রাজনীতি আসে, রাজনীতি যায়, দলের লোগো বদলায়, কিন্তু শহিদের রক্ত কোনও দলের হয় না, উপদলেরও নয়। রক্তের কোনও প্রতীক নেই, পতাকা নেই। শহীদের স্মৃতি সততই এক স্বতঃসিদ্ধ স্বকীয় অভিজ্ঞান। এই বাস্তবতা, বদলের বাংলায় আরও একবার মনে করিয়ে দেওয়াটা জরুরি। অনির্বাণ দীপশিখার মতো।