হোলিকা দহন ও দোল উৎসব

বাংলায় দোলযাত্রা (ছবি- Getty Images)

ফাল্গুন মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে হয় বুড়ির ঘর পোড়া বা নেড়া পোড়া আবার কেউ বলে চাঁচর , এই  উৎসবকে হোলিকা দহন  উৎসব বলা হয়। খড় দিয়ে বিশেষ মূর্তি বানিয়ে শুকনো কাঠপাতা স্তূপ করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। কথিত আছে খড়ের ওই মূর্তিটি হোলিকার, ভগবান বিষ্ণুর প্রতি বিদ্বেষী ছিল ঐ হোলিকা ও তার দাদা হিরণ্যকশিপু। অথচ হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ ছিল বিষ্ণূর ভক্ত, সেই রাগেই প্রহ্লাদকে মারার জন্য হিরণ্যকশিপু নির্দেশ দেয় হোলিকাকে সে যেন প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দেয়। অথচ এমনই আশ্চর্য ব্যাপার যে হোলিকা আগুনে পূড়ে মারা যায় আর প্রহ্লাদের কিছুই হয় না। এই ঘটনার স্মৃতিতেই হোলি উৎসব বা নেড়া পোড়া উৎসব। সমগ্র ভারতবর্ষে এই অশুভ শক্তি বিনাশের চল আজও প্রচলিত আছে।

এই বিশ্বের যিনি সৃষ্টিকর্তা তথা পালনকর্তা যাকে ছাড়া জগত মিথ্যে সেই সকল রসের আধার শ্রীকৃষ্ণকে অবলম্বন করেই এই দোল উৎসব বছরের তিনটি পূর্ণিমায় শ্রীকৃষ্ণের তিনটি যাত্রা তার মধ্যে প্রথম পূর্ণিমায় দোল যাত্রা , দ্বিতীয় পূর্ণিমায় ঝুলন যাত্রা এবং তৃতীয় পূর্ণিমায় শ্রেষ্ঠ লীলা রাসলীলা বা রাসযাত্রা।

দোল উৎসবকে ঘিরে হিন্দুরা তাদের দেবতাকে নানান ক্রিয়াকলাপে যেমন ফুল, ফল,ধূপ, দীপ, চন্দন, আবির ইত্যাদির দ্বারা অর্চনা করে থাকে। আবিরে আবিরে রাঙ্গিয়ে দেয় তাদের প্রাণপুরুষ তথা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে। বৃন্দাবনে দোল পূর্ণিমার উতসবে গোপ নারীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের নৃত্য উৎসব নৃত্যগীত হত। শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ষ্রীরাধা ও গোপীকন্ঠে আলিঙ্গিত হওয়ার স্পন্দন কম্পন যে কতদূর প্রসারিত তা একমাত্র শ্রীরাধা ও গোপিণীরাই উপলব্ধি করতে পারত। শ্রীকৃষ্ণের রূপের মধ্যে শ্যাম রূপেই শ্রেষ্ঠ। ধামের মধ্যে ব্রজধামই শ্রেষ্ঠ। আর নানা ব্য়সের ধাপে কৈশোর বয়সটি শ্রেষ্ঠ। নানান রসের মধ্যে মধুরসই সর্বশ্রেষ্ঠ আর মধুম্য় রসের মধ্যে দোল উৎসবই অন্যতম।


জগতের সৃষ্টি ও রক্ষার জন্য ভগবানকে অবতার রূপে অবতরণ করতে হয়েছে। অবতার হয়ে তিনি বিভিন্ন কার্য করেন সেটাই তার লীলা , লীলার জন্য এক হরি হলেন রাধা ও কৃষ্ণ , সখীদের নিয়ে আনন্দই হল স্বরূপানন্দ, স্বরূপানন্দ একাকী সম্ভব হয় না, তাই তিনি সৃষ্টি করলেন সদা সখী, পিতামাতা , দাসদাসী, প্রেমের পর্যায়ে ভগবান হলেন পুরুষমাত্র আর সকল ভক্তই তার স্ত্রী। শ্রীকৃষ্ণ সকল রমণির ভোক্তা, তিনিই সকলের একমাত্র পতি।

বৃন্দাবন লীলা আস্বাদন ইন্দ্রিয় বিলাসমাত্র। এই লীলার মধ্যে ফাল্গুনী তিথিতে যে দোল উৎসব হয় তাকে বসন্ত উৎসব বলে। ঋতুরাজ বসন্ত আসে নানা রঙ্গে আপ্লুত হয়ে, তাই তো মানুষ ও দোল উতসবে নানা রঙ্গে রাঙ্গিয়ে তোলে তার পতিদেবতা শ্রীকৃষ্ণকে, সঙ্গে চলে অবিরাম নাম সংকীর্তন,তারপর তারা নিজেরা নিজদের মধ্যে ফাগের রঙে রাঙ্গিয়ে নিয়ে নিজেদের দেহ ও মন। রঙ্গের হুল্লোড়ে মেতে ওঠে আপামর জগতবাসী। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ প্রেমিকা রাধা ও গোপবালাদের নিয়ে দোলের উতসবে মেতে উঠতেন । গোলাপের পাপড়ি, পিচকারি দিয়ে রঙ্গে রঙে অপরকে সিক্ত করা হত। লাড্ডূ বিতরণ , এইসবই চলত এই উৎসবে।

শুক্ল পঞ্চমী তিথি থেকে শুরু হয়ে যেত এই দোল উৎসব। সরস্বতী পুজোর দিন থেকে চল্লিশ দিন ধরে চলত এই উৎসব। বৃন্দাবনের মাটির অণু-পরমাণু রাধে রাধে এই নামে অনুরণিত হতে থাকে। কৃষ্ণ নয়, বৃন্দাবনের প্রধান রাধিকাই। কৃষ্ণকে পেতে গেলে ‘লীলা’ অর্থাৎ রাধিকাকেই সন্তষ্ট করতে হবে।

বসন্ত পঞ্চমীর দিন বাঁকেবিহারী, গোবর্ধন রাধাবল্লভ , রাধা দামোদর সহ সমস্ত মন্দিরে আগে হোলি উৎসব শুরু হয়। বিগ্রহের গায়ে আবির ও পিচকারির রঙে ভরিয়ে দিতে পূজারী ভক্তদের উদ্দেশ্যো রং ছুড়ে দিলে শুরু হয়ে যায় রঙ্গের খেলা। বৃন্দাবনের অলিগলি , রাস্তাঘাট, যমুনার জলও রেঙ্গে উঠে রঙে।

দ্বাপরে মথুরা , বৃন্দাবনবারসানা (যেখানে শ্রীমতি রাধার জন্মস্থান) গোকুল, নন্দগাঁও এ নিয়েই ব্রজভুমি। সেখানকার রঙ্গের খেলায় সকলেই সন্ত্রস্ত কারণ যশোদানন্দন যখন কী দুষ্টুমি করে ফেলে। গোপীদের সাজে সেজে তাদের মধ্যে মিশে গিয়ে তাদের ও রাধাকে রং মাখানো , পিচকারির রঙে সিক্ত করে দেওয়া , জল আনতে যাবার সময় কলসি ভেঙ্গে দেওয়া , এসবই ছিল তার ছলাকলা । রাধা ও গোপিনীরা লাঠি নিয়ে তাড়া করত। কানাইয়ের পিছে পিছে। এই থেকেই লাঠমারা উৎসব শুরু হল। রাধিকার জন্মস্থান বারসানায় দোলের দিনের চারদিন আগে থেকেই এই লাঠমারা উৎসব , নৃত্যানুষ্ঠান, আবির ও রঙ্গের খেলা শুরু হয়ে যায়।  বৃন্দাবনের পথে পথে বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে সাধুসন্ন্যাসীর রং ছড়াতে ছড়াতে , নাম- সংকীর্তন আর রাধে রাধে নামের জয়ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে। রথের উপর কাঠের সিংহাসনে, হাতির ওপর রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ নিয়ে আবির ছুড়ে ভক্তদের রাঙ্গিয়ে দিতে চলে শোভাযাত্রা। জীবন্ত বালক বালিকারা রাধাকৃষ্ণ সেজে পথ পরিক্রমা করতে থাকে। বৃন্দাবনের অলিতে গলিতে লাড্ডূ বিতরণ।

শুধু বৃন্দাবন নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের যেখানে সেখানে রাধাকৃষ্ণের মন্দির আছে সর্বত্রই রঙে রঙে ভরে ওঠে । জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠে এই উৎসবে। স্বয়ং ভগবান এসে গোপপল্লিতে সকলের সঙ্গে মিশে , জাতপাতের ঊর্ধ্বে উঠে এই উৎসবকে সর্ব্জনীন উৎসব বলে গণ্য করেছিলেন। এই আনন্দের মাঝে সকল মানুষ হয়ে ওঠে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে , দোল উতসবের দিন শ্রী শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব হয়েছিল। তাই গৌড়ীয় বৈষ্ণব গণ ভক্তিভরে এই উৎসব পালন করেন। শ্রীচৈতন্য গতাধর পণ্ডিতকে দোলায় বসিয়ে আবির ও কুমকুমে চর্চিত করেছিল, তাই এই দিনটি বৈষ্ণব্দের কাছে গৌরপূর্ণিমা বলে বিশেষভাবে সমাদৃত ও মাহাত্ম্যপূর্ণ।

শান্তিনিকেতনে এই দিনটি বসন্তোতসব বলে পালিত হয়। রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গানে ফুল ও আবির দিয়ে এই উৎসবকে সমাদৃত করা হয়। রবীন্দ্রনাথের বসন্তের গানে ফুল ও আবির দিয়ে এই উৎসবকে সমাদৃত করা হয়। কবি নজরুল ও হোলি উৎসবকে নিয়ে নানান গান রচনা করেছেন। প্রচলিত কথায় ভগবান ও বড়দের পায়ে আবির দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ছোটরা আর বড়রা আবির দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় ছোটরা আর বড়রা আবির দিয়ে আশীর্বাদ করেন। কার্যকারণ যাই হোক দোলের মাহাত্ম্য অপরিসীম । ভারতের সেরা ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই উৎসব। সমস্ত বন্ধন কে ছিন্ন করে এই রঙ্গের উৎসব করে তুলেছে সবাইকে প্রেমময় যা আমারে ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে রাখে অটুট।