• facebook
  • twitter
Wednesday, 20 May, 2026

অমানবিক

আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। এসসি-এসটি অত্যাচার বিরোধী আইন রয়েছে, কিন্তু তার যথাযথ এবং দ্রুত প্রয়োগ না হলে তার কোনো অর্থ থাকে না।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

উত্তরপ্রদেশের কানপুর ও চন্দৌলির দুটি ঘটনা আমাদের সমাজের এক ভয়াবহ, অমানবিক মুখ উন্মোচন করে দিয়েছে। একটি ষোলো বছরের কিশোর— তার অপরাধ, সে তৃষ্ণার্ত হয়ে একটি বালতি থেকে জল খেতে গিয়েছিল। সেই ‘অপরাধে’ তাকে উলঙ্গ করে মারধর করা হয়েছে, তার হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তাকে বাধ্য করা হয়েছে জুতোর ওপর থুতু ফেলে তা চাটতে। এই ঘটনাকে যদি আমরা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তবে তা হবে আমাদের নিজেদের বিবেকের প্রতি চরম অবিচার।

এই ঘটনা শুধু একজন কিশোরের উপর নির্যাতন নয়; এটি আমাদের সমাজে বর্ণভিত্তিক বৈষম্য, ঘৃণা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের নগ্ন প্রকাশ। যে সমাজে আজও একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে স্পর্শের কারণে অপমানিত করে, সেখানে সভ্যতার সমস্ত দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে। আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, অর্থনীতিতে উন্নতির স্বপ্ন দেখি, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের এই আচরণ আমাদের কোথায় দাঁড় করায়?

Advertisement

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো প্রশাসনের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া। পুলিশের একজন দায়িত্বশীল আধিকারিক যখন এমন একটি নৃশংস ঘটনাকে ‘কিছু মানুষের মধ্যে ঝগড়া’ বলে বর্ণনা করেন, তখন তা শুধু সংবেদনশীলতার অভাবই নয়, বরং সমস্যাটিকে ছোট করে দেখার একটি প্রবণতা প্রকাশ করে। এই মনোভাবই অপরাধীদের সাহস জোগায়, কারণ তারা বুঝে যায়— তাদের কাজের যথাযথ বিচার নাও হতে পারে।

Advertisement

চন্দৌলির ঘটনাটিও সমানভাবে ভয়াবহ। সেখানে একজন যুবককে বন্দুক দেখিয়ে অপমানজনক কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছে এবং সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল শারীরিক নয়, মানসিক সন্ত্রাসের একটি রূপ। এই ধরনের কাজের উদ্দেশ্য একটাই— ভয় সৃষ্টি করা, সমাজে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা।

জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর পরিসংখ্যানও এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। দলিতদের উপর অত্যাচারের ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশ শীর্ষে। এই সংখ্যাগুলি শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি করে জীবন, একটি করে পরিবার ও তাদের সম্মানহানি।

এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, কেন এই ঘটনা বারবার ঘটছে? কেন এখনও মানুষ বর্ণের ভিত্তিতে অন্য মানুষকে হেয় করার সাহস পায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত মানসিকতা, শিক্ষার অভাব এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতির দিকে তাকাতে হবে।

প্রথমত, শিক্ষার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা জরুরি। শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, মানুষ হিসেবে অন্য মানুষকে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে। পরিবার, স্কুল এবং সমাজ— সব জায়গাতেই এই মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ অপরিহার্য। এসসি-এসটি অত্যাচার বিরোধী আইন রয়েছে, কিন্তু তার যথাযথ এবং দ্রুত প্রয়োগ না হলে তার কোনো অর্থ থাকে না। অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সমাজে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়— এই ধরনের কাজের কোনো স্থান নেই।
তৃতীয়ত, প্রশাসনের সংবেদনশীলতা বাড়ানো জরুরি। যারা আইনের রক্ষক, তাদেরই যদি সমস্যার গুরুত্ব উপলব্ধি না থাকে, তবে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সবশেষে, আমাদের নিজেদেরও আত্মসমালোচনা করতে হবে। আমরা কি সত্যিই এই ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছি, নাকি কিছুদিন পরে ভুলে যাচ্ছি? মানবিকতা শুধু কথায় নয়, কাজে প্রকাশ পায়। কানপুরের সেই কিশোরের চোখের জল, তার অপমান— এগুলি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতীক। এই ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হলে আমাদের আরও সচেতন, আরও মানবিক হতে হবে। নইলে প্রশ্নটি থেকেই যাবে— আমরা কি সত্যিই একটি সভ্য সমাজে বাস করছি?

Advertisement