পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সাক্ষী রইল রাজ্য। শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্যমন্ত্রী পদে অভিষেক শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং রাজনৈতিক ভাষ্য ও প্রশাসনিক দর্শনের এক নতুন রূপায়ণের দাবি। তাঁর ঘোষিত নীতি— ‘আমি নই, আমরা’— এই মুহূর্তে রাজনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই আলোচনার কেন্দ্রে।
শুক্রবার অমিত শাহর উপস্থিতিতে নিউ টাউনের বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির জয়ী প্রার্থীদের বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তাঁকে পরিষদীয় দলনেতা ও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০২১ সালের নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক প্রতীকী লড়াই থেকে ২০২৬-এর চূড়ান্ত ক্ষমতা দখল— এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার এক পূর্ণতা এল। উল্লেখযোগ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নন্দীগ্রামে পরাজিত করার পর থেকেই শুভেন্দু যে বিজেপির মুখ হয়ে উঠেছেন, তা স্পষ্ট ছিল। ভবানীপুরেও তাঁর জয় সেই ধারাবাহিকতাকেই প্রতিষ্ঠা করেছে।
Advertisement
তবে এই পরিবর্তনের আসল তাৎপর্য কেবল নির্বাচনী জয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বহন করে। শুভেন্দুর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ‘আমরা’— এই সমষ্টিগত চেতনা। তাঁর এই অবস্থান সরাসরি পূর্ববর্তী সরকারের ‘কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্তগ্রহণ’-এর সমালোচনার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক মহলের একাংশ দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে এসেছে যে, প্রশাসনে ‘একক নেতৃত্ব’-এর আধিপত্য নীতিনির্ধারণে বৈচিত্র্য ও অংশগ্রহণকে সীমিত করেছে।
Advertisement
এই প্রেক্ষাপটে শুভেন্দুর ‘আমরা’-কেন্দ্রিক রাজনীতি এক ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ ‘আমিত্ব’-এর বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: এই ভাষ্য বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হবে? দলীয় সংগঠন ও সরকার কি সত্যিই সমান্তরাল ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
শুভেন্দুর বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কর্মনির্ভরতা। তাঁর ঘোষণা—‘কথা কম, কাজ বেশি’— রাজনৈতিক ভাষণের এক পরিচিত রূপ হলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে এর বাস্তব প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দীর্ঘদিনের শাসনের পর মানুষের প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে প্রশাসনিক জবাবদিহিতার দাবি। ৪৬ শতাংশ ভোট সমর্থনকে ৭০ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান পরিবর্তন।
এখানেই উঠে আসে ‘ডাবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রসঙ্গ। নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ বারবার এই মডেলের উপযোগিতার কথা বলেছেন। কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত প্রশাসন যে উন্নয়নের গতি বাড়াতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাত বা মধ্যপ্রদেশের উল্লেখ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সেই মডেল কার্যকর হলে পরিকাঠামো, শিল্প ও সামাজিক প্রকল্পে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব— এমনটাই বিজেপির দাবি।
তবে এই মডেলের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব সমন্বয়ের উপর, রাজনৈতিক স্লোগানের উপর নয়। কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক যদি সহযোগিতার বদলে নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তা উল্টে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াতেও পারে।
শুক্রবারের শুভেন্দুর ভাষণে আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতির প্রশ্নও গুরুত্ব পেয়েছে। সন্দেশখালি থেকে আরজি কর পর্যন্ত নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কমিশন গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির তদন্ত— এই প্রতিশ্রুতিগুলি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বিষয়গুলিই নির্বাচনী প্রচারে প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছিল। কিন্তু কমিশন গঠনই শেষ কথা নয়— তার নিরপেক্ষতা, কার্যকারিতা ও ফলাফলই শেষ পর্যন্ত সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপিত হয়– রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কি প্রশাসনিক কাঠামোকে বদলাতে সক্ষম? নাকি প্রশাসনিক বাস্তবতা সেই প্রতিশ্রুতিকে সীমাবদ্ধ করে দেয়? শুভেন্দুর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এই ব্যবধান দূর করা।
সবশেষে, তাঁর উচ্চারিত মন্ত্র— ‘চরৈবেতি, চরৈবেতি’— একটি ধারাবাহিক অগ্রগতির আহ্বান। কিন্তু এই অগ্রগতি কেবল রাজনৈতিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হতে হবে। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরেই তার ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের সন্ধানে রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘সোনার বাংলা’ কেবল একটি স্লোগান নয়, বরং একটি বাস্তব প্রত্যাশা।
শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে, তা নির্ভর করবে তাঁর ঘোষিত ‘আমরা’-র রাজনীতি বাস্তবে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর হয় তার উপর। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, রাজনীতিতে শব্দের চেয়ে কাজের মূল্য অনেক বেশি।
Advertisement



