পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এক্সিট পোলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক এক গবেষণাকে ঘিরে। ২০০১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত পাঁচটি নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, টুডেজ চানক্য, অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টিভি-ভিএমআর-সহ বিভিন্ন সমীক্ষা সংস্থা প্রায় নিয়ম করেই বড় ধরনের ভুল করেছে।
গবেষণার দাবি, বাংলার ক্ষেত্রে এই ভুলের একটি নির্দিষ্ট ধরণ রয়েছে—যে দল শেষ পর্যন্ত জেতে, তাকে ধারাবাহিকভাবে কম করে দেখানো হয়। গত দুই দশকে এক্সিট পোলগুলির গড় আসন ত্রুটি প্রায় ৪৫। অর্থাৎ, জয়ী দলের আসন সংখ্যা গড়ে অন্তত ৪৫টি কম দেখানো হয়েছে।
Advertisement
এই প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আসে ২০২১ সালের নির্বাচনে। অধিকাংশ সমীক্ষা সংস্থা যেখানে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ছবি তুলে ধরেছিল, সেখানে বাস্তবে তৃণমূল ২১৫টি আসন পেয়ে বিপুল ব্যবধানে জয়ী হয়। এই ঘটনাকে গবেষণায় “সমষ্টিগত ব্যর্থতা” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
Advertisement
সমীক্ষা সংস্থাগুলির পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখা যায়, টুডেজ চানক্য তুলনামূলকভাবে কম ত্রুটির সঙ্গে সঠিক বিজয়ী দল চিহ্নিত করতে পেরেছে। তাদের গড় ত্রুটি প্রায় ৩৫ আসনের কাছাকাছি, যা বাংলার মতো জটিল রাজ্যে তুলনামূলকভাবে কম।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে ইন্ডিয়া টিভি-ভিএমআর বিজেপির বিপুল জয় দেখালেও বাস্তবে ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। এই বিশাল ত্রুটিকে বাংলার এক্সিট পোল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিচ্যুতি বলা হচ্ছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া-র সিদ্ধান্ত। ২০২১ সালে বড় ব্যবধানের ভুল করার পর তারা ২০২৬ সালের এক্সিট পোল প্রকাশ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। তাদের যুক্তি, বাংলায় বিপুল সংখ্যক ভোটার সমীক্ষকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না, যা ‘নীরব ভোটার’ সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
গবেষণায় এক্সিট পোল ব্যর্থ হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, বহু ভোটার নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে চান না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে ভয় ও চাপ কাজ করে। তৃতীয়ত, গ্রামীণ এলাকার তুলনায় শহুরে বুথ বেশি নেওয়া হয়, ফলে বাস্তব চিত্র বিকৃত হয়। চতুর্থত, বাণিজ্যিক কারণে অনেক সময় ‘হাড্ডাহাড্ডি লড়াই’ দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলার নির্বাচনে ভোট শতাংশ আর আসন সংখ্যার সম্পর্ক সরল নয়। এই জটিল সমীকরণ ঠিকভাবে ধরতে না পারলে পূর্বাভাসে বড় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
২০২৬ সালের এক্সিট পোলেও একই বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন পূর্বাভাস দিচ্ছে। তবে গবেষণার বিশ্লেষণ বলছে, অতীতের প্রবণতা অনুযায়ী যে দল এগিয়ে রয়েছে বলে ধরা হচ্ছে, তাদের প্রকৃত ফল আরও বেশি হতে পারে—প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ আসন পর্যন্ত পার্থক্য থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, এই গবেষণা আবারও স্পষ্ট করে দিল—এক্সিট পোল কেবল একটি সম্ভাব্য ইঙ্গিত, চূড়ান্ত ফলাফলই আসল সত্য।
Advertisement



