পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন যত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছচ্ছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে— এই লড়াই কেবল ক্ষমতা দখলের নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র। এই প্রেক্ষাপটে অরবিন্দ কেজরীওয়ালের তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থনে প্রচারে অংশগ্রহণ নিছক একটি রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, এটি বিজেপি-বিরোধী বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তারই বহিঃপ্রকাশ।
কেজরীওয়ালের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো বিজেপির শাসনপদ্ধতির প্রতি তাঁর সরাসরি আক্রমণ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন, বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার, এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ— এই সবকিছুকে তিনি গণতন্ত্রের ওপর একপ্রকার আক্রমণ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। ‘বাংলার মানুষ কি সবাই সন্ত্রাসবাদী?’— এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তিনি যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা শুধু রাজনৈতিক ভাষণ নয়, বরং এক বৃহত্তর অসন্তোষের প্রতিধ্বনি।
Advertisement
এই একই সুরে তেজস্বী যাদবও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইকে বিজেপির সর্বশক্তি প্রয়োগের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট— প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং একাংশের মিডিয়া— সবাই যখন একটি রাজ্যের নির্বাচনে একযোগে সক্রিয়, তখন তা স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
Advertisement
এই অভিযোগগুলি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থার সক্রিয়তা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা বাংলার নির্বাচনেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ফলে এই নির্বাচন অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে ‘গণতন্ত্র বনাম কেন্দ্রীয় আধিপত্য’-এর এক প্রতীকী সংঘর্ষ।
তবে এই বৃহত্তর বিজেপি-বিরোধী ঐক্যের ছবির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠছে— তা হলো রাহুল গান্ধীর তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ। রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেছেন, তৃণমূলের দুর্নীতি ও অপশাসনই বাংলায় বিজেপির উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। তাঁর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে একাংশের বাস্তব ক্ষোভকে প্রতিফলিত করে, কিন্তু একইসঙ্গে এটি বিরোধী ঐক্যের প্রশ্নে এক বড়সড় দ্বিধাও তৈরি করে।
রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, বিজেপির মতো শক্তিশালী সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে বিরোধী শক্তিগুলির মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয় প্রয়োজন। কিন্তু বাংলার মাটিতে কংগ্রেস ও তৃণমূলের এই দ্বন্দ্ব সেই সম্ভাবনাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে একদিকে যেখানে কেজরীওয়াল বা তেজস্বী যাদব বিজেপির বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন, অন্যদিকে রাহুল গান্ধীর সমালোচনা সেই বার্তাকে আংশিকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
তবুও, এই দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও একটি বিষয় স্পষ্ট— বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল এখন কেবল নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃত। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক দলগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস সেই প্রতিরোধের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছে— এমনটাই তুলে ধরার চেষ্টা করছেন বিজেপি-বিরোধী নেতারা।
কিন্তু শুধুমাত্র আবেগ বা প্রতিরোধের ভাষণ যথেষ্ট নয়। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে গেলে উন্নয়ন, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রাহুল গান্ধীর সমালোচনা সেই প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তাই বহন করে— যদি বিরোধী শক্তিগুলি নিজেদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারে, তবে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন আজ দ্বিমাত্রিক এক বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে রয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার রাজনীতি, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে; অন্যদিকে রয়েছে বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, যা সেই প্রতিরোধকে দুর্বল করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বাংলার মানুষই। তাঁদের সামনে প্রশ্ন— তাঁরা কি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার এই প্রবল উপস্থিতিকে সমর্থন করবেন, নাকি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক ভারসাম্যের পক্ষে রায় দেবেন? গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই উত্তরের উপর।
Advertisement



