হীরক কর
খেলার মাঠে যখন খেলোয়াড় আর আম্পায়ার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন সেই ম্যাচকে আমরা বলি ম্যাচ ফিক্সিং। বাংলার নির্বাচনী ময়দান নিয়ে ঠিক এই গুরুতর অভিযোগটাই চারদিকে ঘুরছে। বিজেপি নাকি ভোটের ম্যাচটা আগেই ফিক্স করে ফেলেছে। আর এই ফিক্সিংয়ে যেমন প্লেয়ার কেনা হয়েছে, তেমনই হাত করা হয়েছে আম্পায়ারকেও। গণতন্ত্রের আসরে আম্পায়ার কে? নির্বাচন কমিশন!
Advertisement
কেন বলছি ম্যাচ ফিক্সিং, ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ যাওয়ার বিশেষ প্যাটার্ন দেখলেই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্যাটার্নটা বুঝলে, মনে এই প্রশ্ন আসবেই যে, এ ভাবেও তবে নির্বাচন হাইজ্যাক করা যায় ? কমিশন বলছে, তারা দুভাবে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিস্ট ক্লিনিং করেছে। প্রথম ধাপে বাদ দেওয়া হয়েছে ৬৩ লক্ষ নাম। যুক্তি ? এরা নাকি পার্মানেন্টলি শিফটেড, নয়তো মৃত। যদিও অসংখ্য মানুষ দাবি করছেন, তারা বহাল তবিয়তে নিজের ঠিকানাতেই আছেন, জীবিত আছেন।
Advertisement
এটা গেল প্রথম ৬৩ লক্ষের গল্প। আসল খেলাটা শুরু হলো এরপর যখন আরও ৬০ লক্ষ ভোটারকে সন্দেহজনক বা ডিসক্রিপেন্সি ক্যাটাগরিতে ফেলে দেওয়া হলো। স্রেফ নথিপত্রের দোহাই দিয়ে এই বিশাল জনসমষ্টির নাগরিক পরিচয়কে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হলো।এই প্যাটার্নটাই আসল সত্যটা ফাঁস করে দিচ্ছে।দেখা গেল, ৬০ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারের মধ্যে ৩২ লক্ষ ৬৮ হাজার শেষমেশ বিবেচিত হলেন। যোগ্য বলে তাঁদের নাম লিস্টে ফেরানো হলো। কিন্তু বাকি ২৭ লক্ষের কপালে জুটেছে অযোগ্য তকমা। এক লহমায় ২৭ লক্ষ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলো। তাঁরা আর ভোট দিতে পারবেন না।
এখন হিসাবটা বুঝুন। এই যে দু’রকমের ছাঁটাই মিলিয়ে মোট ৯১ লক্ষ নাম কাটা গেল, তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পথে নামলেন প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ। তাঁরা ট্রাইব্যুনালে আপিল করেছেন। স্বাভাবিক বিচার কী বলে ? নিয়ম বলে, এই ৩৪ লক্ষ মানুষের প্রতিটি আপিল গুরুত্ব দিয়ে শোনা উচিত। খতিয়ে দেখা উচিত কে যোগ্য আর কে অযোগ্য। এটাই গণতন্ত্রের বুনিয়াদ— মানুষ তার সরকার বেছে নেবে।
৩৪ লক্ষ মানুষ ট্রাইবুনালে আপিল করে বলছেন, “আমাদের নাম অন্যায়ভাবে কাটা হয়েছে।” তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই, এই ৩৪ লক্ষের মধ্যে মাত্র একজন মানুষের দাবিও সত্যি, আর তাঁকে যদি ভোট দিতে না দেওয়া হয়— তবে সেটা কি এই নির্বাচনের প্রহসন নয়? গণতন্ত্রে এর চেয়ে বড় রসিকতা আর কী হতে পারে? আর এই রসিকতাটা করছে স্বয়ং নির্বাচন কমিশন! আর সেখানে হস্তক্ষেপ করছে সুপ্রিম কোর্ট।
যে ২৭ লক্ষ ‘অযোগ্য’ ভোটারের তালিকা তৈরি হয়েছে, তাঁদের মানচিত্রটা একবার ভালো করে খেয়াল করুন। পাঁচটা জেলার কথা বলব— দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান আর হাওড়া। এই পাঁচ জেলা মিলে মোট বিধানসভা আসন ১১৮টি। গত নির্বাচনে এই ১১৮টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জিতেছিল ১১০টি আসন ! হাওড়া আর পূর্ব বর্ধমান ছিল বিরোধী-শূন্য! মুর্শিদাবাদে ২২টির মধ্যে ২০টি, উত্তর ২৪ পরগনায় ৩৩টির মধ্যে ২৮টি আর দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩১টির মধ্যে ৩০টি। এবার ঠিক এই পাঁচ জেলা থেকেই ওই ২৭ লক্ষ সন্দেহভাজন ডিলিটেড ভোটারের মধ্যে প্রায় ১৩ লক্ষ ৪৫ হাজার মানুষের নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তৃণমূলের শক্ত জমি যে পাঁচ জেলা, সেখান থেকেই আপনি অর্ধেক ভোটার ছেঁটে ফেললেন! মাথায় রাখতে হবে, এটা কোনো রাজনৈতিক দল করেনি, করেছেন খোদ নির্বাচন প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা আমলারা। তার মানে কমিশন নিজেই মাঠের একজন খেলোয়াড়।
এবার মুদ্রার উল্টো পিঠটা দেখুন। বিজেপির দাপট আছে এমন সাতটি জেলাকে আমরা চিহ্নিত করেছি। ফল কী দাঁড়িয়েছে জানেন ? গোটা রাজ্যে যত নাম কাটা গেছে,তার মাত্র ১০ শতাংশ কাটা পড়েছে এই সাতটি জেলায়! তৃণমূলের দুর্গ পাঁচ জেলায় ৫০ শতাংশ, আর বিজেপির দুর্গ সাত জেলায় মাত্র ১০ শতাংশ! অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? পরিসংখ্যান বলি। দার্জিলিং জেলায় মাত্র ৪৪ হাজার নাম কাটা গেছে, যেখানে গতবার বিজেপি তৃণমূলের চেয়ে পৌনে তিন লক্ষ ভোটে এগিয়ে ছিল। আলিপুরদুয়ারে কাটা গেছে মাত্র ৩,৬৭৮। যেখানে বিজেপি গতবার ক্লিন সুইপ করেছিল। কালিম্পং, বাঁকুড়া, কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, পূর্ব মেদিনীপুর, এই পাঁচ জেলা মিলিয়ে মোট ভোটার বাদ গেছে মাত্র ২ লক্ষ ৬৪ হাজার। অঙ্কটা মেলাতে পারছেন ? বিজেপির সাতটি জেলার বাদ পড়া ভোটারকে পাঁচ দিয়ে গুণ করলে তবেই আপনি তৃণমূলের সেই পাঁচটা জেলার ভোট-কাটা মানুষের সমান হবে! তার মানে, তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে নাম কাটার হার পাঁচ গুণ বেশি!
যেখানে লড়াই ছিল একদম কাঁটায় কাঁটায় টক্কর— সেখানে কমিশনের কাঁচি ঠিক কতটা নির্মমভাবে চলেছে দেখুন। অযোগ্য ঘোষিত হওয়া ভোটারের সংখ্যা সেখানে জয়ের ব্যবধানকে অনায়াসেই ছাপিয়ে গেছে। নদিয়া জেলার দিকে তাকান। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় তৃণমূলের লিড ছিল ২০,৯০৩ ভোটের। আর এবার সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে দেওয়া হয়েছে ২৮,৬২৬ জনের! অর্থাৎ, জয়ের মার্জিনের চেয়ে প্রায় ৮ হাজার ভোট বেশি কেটে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিম বর্ধমান জেলায় তৃণমূল ৪৩,৮৯৩ ভোটে এগিয়ে ছিল। এবার সেখানে অযোগ্য ভোটার কত ? ৭৪,১০০! মানে তৃণমূলের লিডের চেয়ে প্রায় ৩০ হাজার বেশি। দক্ষিণ দিনাজপুরেও ছবিটা এক। যেখানে তৃণমূলের লিড ছিল ৪৫ হাজার, সেখানে নাম কাটা গেছে ৭৬ হাজার মানুষের।
এই যে তিনটে জেলার ৩২টি আসন, যেখানে জয়ের মার্জিনকে টপকে গেছে ভোটার ছাঁটাইয়ের সংখ্যা। এটা কি স্রেফ কাকতালীয়? নাকি এই ছাঁটাইয়ের মাধ্যমেই সেই মার্জিনটাকে ভরাট করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে?
এবার চলুন পূর্ব বর্ধমান জেলায়। যেখানে গতবার সব আসন তৃণমূল পেয়েছিল। গোটা জেলায় তৃণমূলের লিড ছিল ২ লক্ষ ৭৫ হাজার, এবার সেখানে নাম কাটা গেছে ২ লক্ষ ৯ হাজার। মানে, লিডের ৭৬ শতাংশই উধাও! উত্তর দিনাজপুরে চলুন। সেখানে এবার তৃণমূলের লিডের ৬৪ শতাংশই সাবাড় হয়ে গেছে। একই ভাবে হুগলিতে লিডের ৪৩ শতাংশ, হাওড়াতে লিডের ২৯ শতাংশ উধাও।প্যাটার্নটা বুঝতে পারছেন ? গতবার যেখানে তৃণমূল ভালো ব্যবধানে জিতেছিল, সেখানে জয়ের ব্যবধান কমিয়ে দাও। আর যেখানে লড়াই ছিল সমানে সমানে, সেখানে ভোটার ছাঁটাই করে বিরোধী পক্ষকে ওয়াকওভার দিয়ে দাও। অঙ্কের মারপ্যাঁচ থেকে এবার চলুন দেখি সেই অঙ্কের আড়ালে থাকা বিভাজনের রাজনীতিতে। নাম কাটার প্যাটার্ন বলছে, কোপটা সবচেয়ে বেশি পড়েছে সংখ্যালঘু, বিশেষত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে— যারা গত ১৫ বছর ধরে তৃণমূলের শক্ত ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত। মালদহের মানিকচক বিধানসভায় হিন্দু আর মুসলিম জনসংখ্যা মোটামুটি সমান। বিচারাধীন ভোটার-তালিকায় দেখা গেল তালিকায় থাকা ৯৮ শতাংশই মুসলিম! হিন্দু মাত্র ২ শতাংশ। একটা বিধানসভায় দুই সম্প্রদায়ের মানুষই ৫০:৫০ রেশিওতে বসবাস করছেন, অথচ কমিশনের চোখে সন্দেহজনক হয়ে উঠল কেবল একটি বিশেষ ধর্মের মানুষ।
একই ছবি মালদহের মোথাবাড়ি কিংবা মুর্শিদাবাদের শামশেরগঞ্জে। শামশেরগঞ্জে ৮২ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার মধ্যে এবার ৯৯ শতাংশই সন্দেহভাজন তালিকায়। আবার মুর্শিদাবাদ জেলারই বহরমপুরের, যেখানে ৭২ শতাংশ মানুষ হিন্দু, সেখানে সন্দেহভাজন ভোটারের তালিকায় হিন্দুদের হার মাত্র ৪.৭ শতাংশ! অর্থাৎ, যেখানেই ভোটার ছাঁটাই হয়েছে, সেখানে টার্গেট করা হয়েছে নির্দিষ্ট এক সম্প্রদায়কে। এই ঘটনা কি তবে আরএসএস-এর সেই পুরনো দর্শনেরই প্রতিফলন?
আজকের এই প্রশাসনিক তৎপরতা আর ভোটার তালিকার এই তথাকথিত ‘সাফাই অভিযান’ কি তবে সেই পুরনো এজেন্ডাকেই বাস্তবায়িত করছে? প্রশাসন যখন নিরপেক্ষতা ছেড়ে কোনো নির্দিষ্ট চরমপন্থী আদর্শের পথে হাঁটতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটা পোঁতা হয়ে গেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কেন্দ্র ভবানীপুরের দিকেই তাকান। সেখানে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ২২ শতাংশ। কিন্তু যখন ‘অ্যাডজুডিকেশন’ হলো, দেখা গেল তালিকায় থাকা অর্ধেকের বেশি মানুষ— প্রায় ৫২ শতাংশ মুসলিম! ভাবুন একবার, হিন্দুপ্রধান একটি এলাকায় বেছে বেছে সংখ্যালঘু ভোটারদেরই ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে দেগে দেওয়া হলো। পরিসংখ্যানের এই অদ্ভুত বৈষম্য আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
ভুলটা কমিশনের কর্মচারী বা সফটওয়্যারের, কিন্তু সাজা পাচ্ছে সাধারণ মানুষ। নিয়ম বলে, এই ধরনের ‘ক্ল্যরিক্যাল এরর’ ঠিক করার জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত। যতক্ষণ না আপনি নিশ্চিত হচ্ছেন, ততক্ষণ কারও নাম ছাঁটাই করার অধিকার আপনার নেই। কিন্তু কমিশনের কাছে ‘সময়’ কোথায় ? তাদের তো অনেক তাড়া ! কেরলে যখন কমিশনের অফিশিয়াল নথিতে বিজেপির ছাপ দেখা গিয়েছিল, তখন আপনারা বলেছিলেন, ‘ভুল হয়েছে, ক্ষমা চাইছি’। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ৯১ লক্ষ মানুষের নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে অন্য গল্প কেন ? আপনারা কি নিরপেক্ষ আম্পায়ার, নাকি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের ‘ইলেকশন সেল’ হিসেবে কাজ করছেন? প্রশ্নগুলো অপ্রিয়, কিন্তু উত্তর তো আপনাদের দিতেই হবে।
Advertisement



