• facebook
  • twitter
Sunday, 5 April, 2026

নেপালের বর্তমান সরকার ও একটি আশঙ্কা

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপাল আবার একটি অভূতপূর্ব ছাত্র ও যুব আন্দোলনের সূচনা করে যা ‘জেন-জি মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত।

সুকান্ত পাল

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র সংগ্রামের এক দীর্ঘ ঐতিহ্য বর্তমান। দীর্ঘদিন ধরে নেপাল রাষ্ট্রটি একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল। রাজতন্ত্রই নেপালে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত। নেপালের জনগণেরও এই রাজতন্ত্রের প্রতি যথেষ্ট মান্যতা এবং ভয়- ভক্তি মিশ্রিত আস্থা ছিল।

Advertisement

কিন্তু দিন যতই এগিয়েছে, বিশ্ব রাজনীতির বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা, মতাদর্শ যত পরিবর্তিত হয়েছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন রাজতান্ত্রিক দেশ যখন ধীরে ধীরে শুধুমাত্র নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রকে নামে মাত্র টিকিয়ে রেখেছে, কোথায়ও কোথায়ও রাজতান্ত্রিক ধারণাটাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে তখন সেই রাজনৈতিক অভিঘাত নেপালেও এসে পড়েছে।

Advertisement

১৯৫১ সালে রানা শাসনের অবসান থেকে শুরু করে ২০০৬ সালে লোকতান্ত্রিক আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে‌ নেপালের ছাত্র সমাজের অংশগ্রহণ ও ভূমিকা ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাব বিস্তারকারী। এই ছাত্ররাই জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বিকাশের কাজটি বেশ দক্ষতার সঙ্গেই পালন করে এসেছেন। বিশেষ করে পঞ্চায়েতের শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে নেপালি ছাত্র সংঘ ( Nepali Students Union) এবং অল্ নেপাল ন্যাশানাল ফ্রি স্টুডেন্টস্ ইউনিয়ন ( ANNFSU) এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

নেপালের বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে এই ছাত্র সমাজের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, সেই ১৯৫১ সাল থেকে লক্ষ্যণীয়। এক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালের ছাত্র আন্দোলন একটি যুগান্তকারী ঘটনা। সেই বছর পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোর ফাঁসির প্রতিবাদে শুরু হয় ছাত্রদের বিশাল বিক্ষোভ। এই বিক্ষোভ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তাদের দেশের রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ধাবিত হয়। এবং এই আন্দোলন কার্যত সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ আন্দোলনে পরিণত হয়। আন্দোলন এতটাই ভয়াবহ আকার ধারণ করে যে শেষ পর্যন্ত রাজা বীরেন্দ্র শাহ দেশে গণভোটের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হন। শুধু তাই নয়, ১৯৯০ সালেও বহুদলীয় গণতন্ত্রের দাবিতে যে জন আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাতেও মুখ্য ভূমিকা ছিল এই ছাত্র সমাজেরই।

প্রবল আন্দোলনের চাপে রাজা বীরেন্দ্র আবার নতিস্বীকার করেন এবং দলীয় রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হন। কিন্তু পরবর্তীকালে রাজা জ্ঞানেন্দ্র আবার ধীরে ধীরে রাজতান্ত্রিক চরম স্বৈরশাসনের দিকে ঝুঁকলে ২০০৬ সালে জ্ঞানেন্দ্রর শাসনের বিরুদ্ধেই এক ঐতিহাসিক আন্দোলন সংগঠিত করে নেপালের ছাত্র সমাজ।‌ বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ঐতিহাসিক ঊনিশ দিনের এক প্রবল প্রতিরোধ ও প্রতিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। সমস্ত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলি তখন আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়ছিল। এবং শেষ পর্যন্ত রাজতন্ত্রের চূড়ান্ত অবসান ঘটিয়ে তারা নেপালে একটি শক্তিশালী প্রজাতান্ত্রিক শাসন কাঠামো গঠন করতে সমর্থ হয়েছিল। এর ফলে নেপালের দীর্ঘ ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। নেপালের এবং বিশ্ব রাজনীতিতে এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। একটা বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য, সেটা হলো, শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, নেপালের ছাত্ররা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নেপালের সমাজে জাতি বৈষম্য ও লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়ে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সমাজ সংস্কারে এক বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। তারাই ছিল নেপালের পরিবর্তনের অগ্রদূত।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপাল আবার একটি অভূতপূর্ব ছাত্র ও যুব আন্দোলনের সূচনা করে যা ‘জেন-জি মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। এই আন্দোলনের মূল কারণ ছিল নেপাল সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতি,‌ যুবক-যুবতীদের কর্ম সংস্থানের অভাব এবং বর্তমান যুব সমাজের কাছে অত্যন্ত প্রিয় কতগুলি সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করা। বলতে দ্বিধা নেই যে, এই আন্দোলন সমগ্র বিশ্বকে এক দিশা দেখিয়েছে। এক বছর আগেই পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের নামে যে দিক দিশাহীন আন্দোলন হয়েছিল— নেপালের আন্দোলন কিন্তু তা ছিল না। ফলে এই আন্দোলন সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সমর্থন পুষ্ট হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনে ছাত্রদের আত্মত্যাগ এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই আন্দোলনেকে দমন করার জন্য সরকার সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং শেষ পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলনকারীদের বাগে আনতে গুলি চালানো হয়।
এর ফলে ৭৭ জন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান এবং দুই হাজারের অধিক আহত হন। কিন্তু ছাত্ররা দাঁতে দাঁত চেপে একটি লক্ষ্যে স্থির থেকে এক দৃঢ়বদ্ধ সংগ্রামে স্থিত থাকেন। এই প্রবল সংগ্রামের কাছে শাসককে পরাজয় স্বীকার করতেই হয়। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই আন্দোলনে ছাত্ররা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, সঠিক সংকল্প এবং লক্ষ্য থাকলে রাজনৈতিক দল ছাড়াই দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব। এরপর জনগণের রায়ে (যেটা একটা ঐতিহাসিক বিষয়) সাবেক বিচারপতি সুশীলা কারকি অন্তবর্তী সরকার গঠন করেন। তিনিই ছিলেন দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে নতুন সরকারের হাতে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা তুলে দেন। সুশীলা কারকির নিকট নেপালের জনগণ অন্তর থেকেই কৃতজ্ঞতা বোধ করেন।

নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন বালেন্দ্র শাহ্, যিনি জেন-জি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এবং তিনিই নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন।

প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে গ্রেপ্তার করেন এবং বেশ কিছু সংস্কারের পথে হাঁটেন। এইসব সংস্কারের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভালো সংস্কারও আছে। তার মধ্যে সংসদে তিনি ৩৩ শতাংশ মহিলা সাংসদদের পদ সুনিশ্চিত করেন।

এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু তার দুটি সংস্কারের পদক্ষেপের মধ্যে আবার শাসকের চিরকালীন স্বৈরাচারের পদক্ষেপ খুব মৃদুভাবে হলেও ধ্বনিত হয়ে উঠছে। যে ছাত্র আন্দোলন নেপালের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধারাবাহিকভাবে পালন করে চলেছে এবং যে ছাত্র আন্দোলনের ফলে তিনি আজ দেশের প্রধানমন্ত্রী, সেই ছাত্র রাজনীতি ও ট্রেড ইউনিয়নকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এখানে প্রশ্ন উঠে যাচ্ছে, তবে কি নেপালে আবার কোনও আন্দোলনের বীজ অঙ্কুরিত হয়ে উঠছে? একটা আশঙ্কা কিন্তু তৈরি হচ্ছে। এই আশঙ্কা সত্যি কিনা, আগামী দিনের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপই সে কথার উত্তর দেবে।

Advertisement