• facebook
  • twitter
Thursday, 2 April, 2026

বিদেশে গড়ে ৫ বছরে দৈনিক ২০ জনের প্রাণহানি, ভারতীয় শ্রমিকদের মৃত্যু ও নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ

কোনও ভারতীয় নাগরিক বিদেশে নির্যাতন বা শোষণের শিকার হলে ভারতীয় দূতাবাস ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে

 বিদেশে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুললো কেন্দ্রের প্রকাশিত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ বছরে দৈনিক গড়ে বিদেশে কর্মরত ২০ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যু ঘটেছে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে।

ইরান যুদ্ধের জেরে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে বসবাসকারী অস্থায়ী ভারতীয় বাসিন্দাদের নিয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, সেই সময় এই অস্বস্তিকর তথ্য সামনে আনল বিদেশ মন্ত্রক।রাজ্যসভায় বিরোধীদের লিখিত প্রশ্নের লিখিত জবাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং।

Advertisement

তিনি জানিয়েছেন, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫-এর মধ্যে বিদেশে ৩৭ হাজার ৭৪০ জনেরও বেশি ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালে সবচেয়ে বেশি, ৮ হাজার ২৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ সালে কমে হয় ৬ হাজার ৬১৪ জন। পরবর্তী তিন বছরে, যথাক্রমে ২০২৩-এ ৭ হাজার ৯২১, ২০২৪-এ ৭ হাজার ৭৪৭ এবং ২০২৫ সালে ৭ হাজার ৮৫৪ জন ভারতীয় শ্রমিক বিদেশে প্রাণ হারান। 

Advertisement

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে। মোট মৃত্যুর ৮৬ শতাংশই এই অঞ্চল থেকে নথিভুক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর খবর মিলেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং সৌদি আরব থেকে। এই সংখ্যা যথাক্রমে ১২ হাজার ৩৮০ এবং ১১ হাজার ৭৫৭ জন। 

কুয়েত, ওমান, মালয়েশিয়া এবং কাতারে যথাক্রমে ৩,৮৯০, ২,৮২১, ১,৯১৫ এবং ১,৭৬০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে।কমনওয়েলথ হিউম্যান রাইটস ইনিশিয়েটিভ বা সিএইচআরআই-এর ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত নথিপত্রের এক বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ১০ জন ভারতীয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

এই তথ্যটি তথ্য অধিকার আইন বা আরটিআই-এর অধীনে সংসদীয় নথিপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।গত ২০২১ থেকে ২০২৫, পাঁচ বছরের সময়পর্বে বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে নির্যাতন, শোষণ, এবং কর্মক্ষেত্র সংক্রান্ত ৮০ হাজার ৯৮৫ টি অভিযোগ জমা পড়ে। ২০২১-‘২৫-এর মধ্যে সবচয়ে বেশি অভিযোগ আরব আমিরশাহীতে, ১৬ হাজার ৯৬৫ জন। এরপর রয়েছে কুয়েত এবং সৌদি আরব। 

এর পরেই রয়েছে কুয়েত ১৫ হাজার ২৩৪, ওমান ১৩ হাজার ২৯৫ এবং সৌদি আরব ১২ হাজার ৯৮৮। উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, মালয়েশিয়া ও মালদ্বীপে যথাক্রমে ৮ হাজার ৩৩৩টি এবং ২ হাজার ৯৮১টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।

মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ৮০ শতাংশেরও বেশি মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে ঘটে। এছাড়া ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণে এবং ৬ শতাংশের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। মৃত শ্রমিকদের অধিকাংশই নির্মাণ ও গৃহকাজে কর্মরত ছিলেন।

বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং দাবি করেছেন, হাইকমিশন অভিযোগ পাওয়া মাত্র বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তার পরেও এই পরিমাণ মৃত্যু কীভাবে ?

উল্লেখ্য যে, গত পাঁচ বছরে শ্রম সংক্রান্ত সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অভিযোগের সংখ্যা ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছয়, যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ হাজার ৪৭৯টি। যেখানে ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ২৬৩। ২০২১ সালের সাথে তুলনা করলে, যখন ১১ হাজার ৬৩২টি শ্রম সংক্রান্ত ঘটনার কথা জানানো হয়েছিল, তখন থেকে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। 

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র জানিয়েছে, বিদেশে ভারতীয়দের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রম ও জনশক্তি সহযোগিতা চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি, কোনও ভারতীয় নাগরিক বিদেশে নির্যাতন বা শোষণের শিকার হলে ভারতীয় দূতাবাস ও অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই উদ্যোগ সত্ত্বেও এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যু ও অভিযোগ কীভাবে ঘটছে ? বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement