পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ঘিরে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে জ্বালানি সঙ্কট ক্রমশ গভীর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ-র প্রধান ফাতিহ বিরোল সতর্ক করে জানিয়েছেন, এপ্রিল মাসে তেল সরবরাহের সমস্যা মার্চের তুলনায় দ্বিগুণ হতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে ইউরোপের জ্বালানি পরিস্থিতিতে।
আইইএ-র মতে, ইতিমধ্যেই পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের জেরে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমে গিয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামো—তৈলকূপ ও শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে চাপ বাড়ছে এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
Advertisement
সঙ্কটের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে সরবরাহ হয়। ইরান এই জলপথ কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে।
Advertisement
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে ইরানের নতুন সিদ্ধান্তে। এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের উপর উচ্চ হারে টোল বসানোর পরিকল্পনা কার্যকর করা হয়েছে। সূত্রের দাবি, প্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লক্ষ ডলার পর্যন্ত টোল ধার্য হতে পারে। শুধু তাই নয়, আমেরিকা ও ইজরায়েলের জাহাজগুলির চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তেহরান, যা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এই অবরোধের ফলে শুধু ইউরোপ নয়, এশিয়ার দেশগুলিও বিপাকে পড়েছে। বিশেষ করে ভারতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। হরমুজ সংলগ্ন অঞ্চলে ভারতের পতাকাবাহী একাধিক জাহাজ আটকে রয়েছে, ফলে তেল আমদানিতে প্রভাব পড়ছে। যদিও ভারতকে ‘বন্ধু দেশ’ হিসেবে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে, তবুও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
আইইএ প্রধানের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সঙ্কট তৈরি হচ্ছে জেট ফুয়েল ও ডিজেলের ঘাটতি নিয়ে। এশিয়ায় ইতিমধ্যেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে, এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ইউরোপেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে কুয়েত ও ইরাকের মতো উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলিও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহণ সম্ভব না হলে বিকল্প পথ খুবই সীমিত। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র দেশগুলি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়লে তারা পিছিয়ে পড়বে এবং জ্বালানি ঘাটতির মুখে পড়বে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে এই অচলাবস্থা শুধু আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার উপর বড় প্রভাব ফেলতে চলেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আগামী দিনে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, যার ধাক্কা পড়বে বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
Advertisement



