রাজনীতির ভাষায় একে কল্যাণমূলক প্রকল্প বলা হয়, প্রশাসনের ভাষায় সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা, আর যুবসমাজের চোখে এটি সাময়িক আশ্রয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন প্রকল্প ‘যুবসাথী’ সেই তিনটি দিকই একসঙ্গে সামনে এনে দিয়েছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন যে, ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী, অন্তত মাধ্যমিক উত্তীর্ণ কিন্তু নিয়মিত চাকরি পাননি এমন যুবকদের প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
কিন্তু এই প্রকল্পের বাস্তবতা যত সামনে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে একটি বড় সামাজিক সত্য— শহর কলকাতায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুবক এখনও স্থায়ী কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় রয়েছেন। কলকাতা পুরসভার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রায় ২.২ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। অর্থাৎ এত সংখ্যক তরুণ-তরুণী অন্তত মাধ্যমিক পাশ করেও এখনও নিয়মিত কাজের সুযোগ পাননি।
Advertisement
এই সংখ্যাটিই আসলে প্রকল্পটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। কারণ ১৫০০ টাকার ভাতা নিশ্চয়ই বড় অর্থনৈতিক সহায়তা। প্রশাসনিক দিক থেকেও এখন তৎপরতা তুঙ্গে। ফেব্রুয়ারি ১৫ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে ৭৩ হাজারের বেশি অনলাইন আবেদন এবং প্রায় ১.৫১ লক্ষ অফলাইন আবেদন জমা পড়েছে। এই বিপুল তথ্য দ্রুত আপলোড করতে চারটি সংস্থাকে কাজে লাগানো হয়েছে। লক্ষ্য— যত দ্রুত সম্ভব আবেদনকারীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ পৌঁছে দেওয়া।
Advertisement
প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্প চালু হওয়ার কথা ছিল আগামী ১ এপ্রিল থেকে। কিন্তু শনিবার মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, প্রকল্পের টাকা দেওয়া শুরু হবে অবিলম্বে। সরকারের যুক্তি– যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তা দ্রুত পূরণ করা উচিত। ইতিমধ্যেই অন্য একটি জনপ্রিয় প্রকল্প লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের অর্থও নির্ধারিত সময়ের আগেই বিতরণ করা হয়েছে।
তবে প্রশাসনিক সূত্রের বক্তব্যে আর একটি রাজনৈতিক বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খুব শিগগিরই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের দিন ঘোষণা হতে পারে। সেই কারণে সরকার চাইছে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে অন্তত কিছু মানুষের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাক। একবার প্রকল্পটি কার্যকর হয়ে গেলে নির্বাচনকালীন বিধিনিষেধের মধ্যেও তা চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে, এমনটাই প্রশাসনের ধারণা।
এই বাস্তবতা ভারতীয় রাজনীতির এক পরিচিত চিত্রকেই আবার সামনে আনে। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির গতি হঠাৎ বেড়ে যায়। শাসক দল চায় ভোটারদের কাছে দ্রুত তার প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ তুলে ধরতে। বিরোধীরা অবশ্য প্রায়ই অভিযোগ করেন, এই ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচনী সুবিধা পাওয়ার কৌশল।
তবে এই রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যায়, যুব সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন কী? সাময়িক আর্থিক সহায়তা নিঃসন্দেহে অনেক পরিবারের জন্য উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে চাকরি খুঁজেও সফল হননি, তাঁদের জন্য এটি স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হিসেবে কর্মসংস্থানের স্থায়ী সুযোগ সৃষ্টি না হলে এই সহায়তা প্রকল্পগুলি শেষ পর্যন্ত সাময়িক উপশম হিসেবেই থেকে যায়। রাজ্যের সরকার নিশ্চয়ই এগুলি বিবেচনার মধ্যে রাখে যাতে তার যুবশক্তি উৎপাদন ও কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি। সরকার জানিয়েছে, কেউ যদি ভুল তথ্য দিয়ে এই ভাতা গ্রহণ করেন, তবে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবেদনকারীদের কাছ থেকে লিখিত ঘোষণাও নেওয়া হয়েছে। এই সতর্কতা প্রয়োজনীয়, কারণ যে কোনও সামাজিক প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার সঠিক বাস্তবায়নের উপর।
সব মিলিয়ে ‘যুবসাথী’ প্রকল্প এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতিফলন। একদিকে এটি সরকারের সামাজিক সহায়তার উদ্যোগ, অন্যদিকে এটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা। রাজ্যের সামনে তাই দ্বৈত দায়িত্ব— স্বল্পমেয়াদে বেকার যুবকদের সহায়তা দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো। কারণ একটি সমাজের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার যুবশক্তি। আশা করা যায়, মুখ্যমন্ত্রীর শিল্পায়নের প্রয়াস আগামীদিনে রাজ্যের শিল্প ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেবে।
Advertisement



