• facebook
  • twitter
Monday, 9 March, 2026

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আবহে তেলের জোগান নিয়ে সতর্ক ভারত

বিশ্বে তেল আমদানির নিরিখে ভারত তৃতীয় স্থানে রয়েছে। রাশিয়ার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার পরে পশ্চিম এশিয়ার উপর ভারতের নির্ভরশীলতাও বেড়েছে।

প্রতীকী চিত্র

পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাতের জেরে তেলের জোগান বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগেভাগেই সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভারতের তৈল শোধনাগারগুলি। দেশের জ্বালানির চাহিদা বজায় রাখতে আমেরিকা, রাশিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে তারা। তৈল ক্ষেত্রের আধিকারিকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের সরবরাহে ভাটা পড়তে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিচ্ছে ভারত।

শোধনাগারগুলিতে অপরিশোধিত তেল থেকে পেট্রোল ও ডিজেলের মতো জ্বালানি তৈরি করা হয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেশের কয়েকটি শোধনাগার কিছুদিন বন্ধ রাখার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। জ্বালানির জোগান বজায় রাখতে এখন পূর্ণ ক্ষমতায় তেল শোধনের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।

Advertisement

প্রসঙ্গত, ভারতের মোট তেলের চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতে যে পরিমাণ তেল আমদানি করা হয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকই এসেছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সেই পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় ইজরায়েল এবং আমেরিকা। তার পরেই তেহরান সতর্ক করে জানায়, ওই প্রণালী দিয়ে কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করলে তা ধ্বংস করা হবে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি জাহাজে হামলার খবর সামনে এসেছে। ফলে ওই পথ দিয়ে তেল আমদানি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

Advertisement

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আমদানি বন্ধ হলেও অন্য যে সব সমুদ্রপথ রয়েছে, সেগুলি এখনও চালু আছে। সংঘাতের প্রভাব নেই এমন দেশগুলি থেকে বেশি পরিমাণে তেল আনার চেষ্টা চলছে। ২০২৫ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৬০ শতাংশই পশ্চিম এশিয়ার বাইরে থাকা দেশগুলি থেকে এসেছে। এর মধ্যে রাশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক সংঘাতের পরে আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই ওইসব অঞ্চলের দেশগুলির থেকে এসেছে বলে জানা গিয়েছে।

এদিকে আমেরিকা জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আগামী এক মাস ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি চালিয়ে যেতে পারবে। তবে শর্ত রয়েছে— ৫ মার্চের আগে জাহাজে তোলা তেলই কেবল কেনা যাবে। এই ছাড় কার্যকর থাকবে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত। বর্তমানে রাশিয়ার প্রায় ১২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বিভিন্ন জাহাজে করে সমুদ্রে রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি জাহাজ ভারতের কাছাকাছি আরব সাগর এবং বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। ওই জাহাজগুলিতে মোট প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ ব্যারেল তেল রয়েছে বলে সূত্রের খবর। এছাড়া সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি সমুদ্র এলাকাতেও প্রায় সত্তর লক্ষ ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে।

গত বছর অক্টোবরে রাশিয়ার দুই তেল সংস্থার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পরে ভারতের কয়েকটি সংস্থা রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছিল। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সেই সংস্থাগুলির কিছু আবার রাশিয়া থেকে তেল কেনা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিস, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড এবং এইচপিসিএল-মিত্তল এনার্জি লিমিটেড।

তেল মন্ত্রকের সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারত পুরোপুরি রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করেনি। কিছুটা কমানো হলেও এখনও সেই আমদানি চলছে। বর্তমানে ভারতের ভান্ডারে প্রায় ১৪ কোটি ৪০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ২৫ দিনের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। পাশাপাশি দেশে মোট ৬৪.৫ দিনের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য মজুত রাখার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে প্রায় ৭৪ দিনের জ্বালানি মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল প্রায় ৭০ মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৬৪০০ টাকা। সংঘাতের পরে সেই দাম বেড়ে হয়েছে প্রায় ৯২ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮৪০০ টাকা। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বিশ্বে তেল আমদানির নিরিখে ভারত তৃতীয় স্থানে রয়েছে। রাশিয়ার উপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার পরে পশ্চিম এশিয়ার উপর ভারতের নির্ভরশীলতাও বেড়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের আমদানিকৃত তেলের প্রায় ৫৩ শতাংশই এসেছে ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরশাহি এবং কাতার থেকে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিকল্প পরিকল্পনা না করলে ভবিষ্যতে তেলের জোগানে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Advertisement