• facebook
  • twitter
Sunday, 1 March, 2026

শুধু রাজীব নন, পূর্বেও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে উন্নয়নের কাজে লাগাতে একাধিক আমলাকে রাজনীতিতে এনেছে তৃণমূল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক আধিকারিকদের রাজনীতিতে আনার মাধ্যমে সরকার নীতি বাস্তবায়নে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।

আমলারা অবসরের পর সাধারণত তাঁদের দীর্ঘ কর্মজীবনের পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতা ধামাচাপা পড়ে যায়। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা কাজে লাগাতে পারলে একদিকে রাজনৈতিক দলগুলি যেমন সাফল্য পায়, তেমনি রাজ্য ও দেশের বহুমুখী পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সঠিক দিশা পায়। আমজনতার হিতার্থে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এইসব অভিজ্ঞ প্রশাসনিক কর্তাদের রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করা দূরদর্শিতার পরিচয়। কিন্তু অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতারা দলীয় গন্ডির বাইরে বেরিয়ে সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সেরে উঠতে পারেন না।

সম্প্রতি রাজ্যসভার চারটি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিল তৃণমূল কংগ্রেস। শুক্রবার রাতে প্রকাশিত তালিকায় অন্যতম বড় চমক সদ্য প্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমারের নাম। দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের পর এবার তাঁর সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ কার্যত নিশ্চিত। এই ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে— প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে নতুন শক্তি জোগাতেই কি এই কৌশল?

Advertisement

তবে জল্পনা যাই চলুক, প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে রাজনীতিতে আসার ঘটনা নতুন নয়। পূর্বে তৃণমূল জমানাতেই প্রশাসন থেকে রাজনীতিতে এসে সফল হয়েছেন আরও প্রায় ১০ জন আইএএস এবং আইপিএস আধিকারিক। রাজ্যে ২০১১ সালে পালাবদলের পর থেকে প্রশাসনের শীর্ষপদে থাকা একাধিক আইএএস ও আইপিএস আধিকারিক রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই হয়েছেন সাংসদ, বিধায়ক এমনকি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী। রাজনৈতিক মহলের মতে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব জ্ঞান থাকায় এঁরা নীতিনির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

Advertisement

তৃণমূল জমানায় প্রশাসন থেকে রাজনীতিতে আসার পথপ্রদর্শক হিসেবে ধরা হয় প্রাক্তন আইএএস আধিকারিক দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ভূমিসংস্কার কমিশনার এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করার পর তিনি তৃণমূলের টিকিটে রাজ্যসভার সদস্য হন। তাঁর এই পদক্ষেপই পরবর্তী প্রজন্মের প্রশাসনিক আধিকারিকদের রাজনীতিতে আসার পথ খুলে দেয়।

এর আগে বাম আমলেও প্রশাসনিক আধিকারিকদের রাজনীতিতে আসার নজির ছিল। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসর নেওয়ার পর আইএএস আধিকারিক বিক্রম সরকার তৃণমূলের প্রতীকে লড়ে হাওড়া ও পাঁশকুড়া থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। একইভাবে প্রাক্তন আইএএস দীপক ঘোষও মহিষাদল থেকে বিধায়ক হন।

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। প্রাক্তন সিবিআই আধিকারিক উপেন বিশ্বাস বাগদা থেকে জিতে অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী হন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব মনীশ গুপ্ত বিদ্যুৎমন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে রাজ্যসভার সাংসদ হন।

একইভাবে প্রাক্তন ডিজি হায়দার আজিজ সফি মন্ত্রী ও ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব সামলেছেন। প্রাক্তন আইপিএস চৌধুরী মোহন জাটুয়া সাংসদ হয়েছেন। আর রচপাল সিং বিধায়ক হয়ে মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। জলপাইগুড়ির প্রাক্তন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জেমস কুজুর এবং প্রাক্তন পুলিশ সুপার সুলতান সিংও তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরের নাম উল্লেখযোগ্য। চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার পদ থেকে অবসর নিয়ে তিনি বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে কারিগরি শিক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব সামলান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক আধিকারিকদের রাজনীতিতে আনার মাধ্যমে সরকার নীতি বাস্তবায়নে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। এক তৃণমূল নেতা বলেন, ‘প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করা আধিকারিকরা রাজ্যের বাস্তব সমস্যা ভালোভাবে বোঝেন। সংসদে তাঁদের উপস্থিতি রাজ্যের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।’ এই পরিস্থিতিতে রাজীব কুমারের রাজ্যসভায় সম্ভাব্য প্রবেশ শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক যাত্রার নতুন অধ্যায় নয়, বরং প্রশাসন ও রাজনীতির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার ইঙ্গিত বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

Advertisement