কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা সম্প্রতি কেরলের নাম পরিবর্তন করে ‘কেরলম’ করার প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। একটি রাজ্যের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পরই স্বাভাবিকভাবে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘বাংলা’ করার প্রস্তাব এত বছর ধরে ঝুলে থাকবে কেন?
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ২০১৮ সালে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ করার সুপারিশ পাঠায়। পরবর্তীকালে কেন্দ্রের পরামর্শ অনুযায়ী ভাষাগত একটিই রূপ বজায় রাখতে বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি তিন ভাষাতেই ‘Bangla’ বা ‘বাংলা’ নামটি গ্রহণ করে আবার প্রস্তাব পাঠানো হয়। অর্থাৎ রাজ্য সরকার প্রক্রিয়াগত শর্ত মেনে নিয়েই এগিয়েছিল। তবু কেন্দ্রের তরফে আজও চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। প্রশ্ন উঠবেই, কেন এই বিলম্ব?
Advertisement
একটি রাজ্যের নাম কেবল প্রশাসনিক পরিচয় নয়; তা ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় ও মানসিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ‘West Bengal’ নামটি উপনিবেশিক ও দেশভাগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। দেশভাগের পর ‘পূর্ববঙ্গ’ আলাদা হয়ে গেলে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি একটি ভৌগোলিক দিকনির্দেশ বহন করে, কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে সেই ‘পশ্চিম’ শব্দটির আর কোনও বাস্তব তাৎপর্য নেই। বরং ‘বাংলা’ নামটি রাজ্যের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি সাযুজ্যপূর্ণ।
Advertisement
কেরলের ক্ষেত্রে ‘কেরলম’ নামটি মালয়ালম ভাষার উচ্চারণ অনুযায়ী। এই পরিবর্তনের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার স্বীকৃতি রয়েছে। একই যুক্তি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি একটি রাজ্য তার ভাষাগত পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নাম চায় এবং সেই প্রস্তাব বিধানসভায় সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়, তবে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে তা অকারণে আটকে রাখা যুক্তিসঙ্গত নয়।
এখানে আরেকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রাজ্যগুলির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতি সম্মান দেখানো কেন্দ্রের দায়িত্ব। নাম পরিবর্তন সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হয়— রাজ্যের প্রস্তাব, সংসদের অনুমোদন ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গ সেই পথই অনুসরণ করেছে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্র যদি দীর্ঘসূত্রিতা দেখায়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক বিলম্ব নয়, তা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রস্তাব ঝুলিয়ে রেখেছে। রাজনৈতিক বাক্যবিন্যাসের বাইরে গিয়েও একটি বাস্তব প্রশ্ন থেকে যায়— যদি কেরলের দাবি পূরণ হতে পারে, তবে পশ্চিমবঙ্গের দাবির ক্ষেত্রে বাধা কোথায়? দুই রাজ্যের ক্ষেত্রেই যুক্তি এক, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম। একটিকে মঞ্জুরি দিয়ে অন্যটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ফেলে রাখা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করে।
অবশ্যই, নাম পরিবর্তন কোনও উন্নয়নমূলক প্রকল্প নয়, এতে তাৎক্ষণিক আর্থিক বা প্রশাসনিক লাভ নেই। কিন্তু আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। একটি রাজ্যের নাগরিকেরা যদি নিজেদের রাজ্যের নাম ‘বাংলা’ হিসেবে দেখতে চান এবং তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতভাবে সেই মত প্রকাশ করেন, তবে গণতান্ত্রিক প্রথা অনুযায়ী সেই ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ভারত বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক এক দেশ। এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই তার শক্তি। তাই এক রাজ্যের সাংস্কৃতিক দাবি স্বীকৃতি পেলে অন্য রাজ্যের অনুরূপ দাবিও ন্যায্য বিবেচনার দাবি রাখে। কেন্দ্রের উচিত এই বিষয়টিকে দলীয় রাজনীতির চোখে না দেখে সাংবিধানিক দায়িত্বের দৃষ্টিতে দেখা।
কেরলমের স্বীকৃতি যদি সাংস্কৃতিক সম্মানের নিদর্শন হয়, তবে বাংলার ক্ষেত্রেও সেই সম্মান প্রদর্শন করা হোক। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা প্রস্তাবের দ্রুত নিষ্পত্তি কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক বার্তা দেবে। একটি নামের মধ্যে যে আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও আবেগ নিহিত থাকে, তাকে অযথা অপেক্ষায় রাখার কোনও কারণ নেই। এখন সময় এসেছে, ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে ‘বাংলা’ হওয়ার দাবির প্রতি ন্যায্য সাড়া দেওয়া উচিত কেন্দ্র সরকারের।
Advertisement



