• facebook
  • twitter
Wednesday, 25 February, 2026

আস্থার পরীক্ষা

সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে আস্থা। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কার্যকর করতে রাজ্য প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য।

প্রতীকী চিত্র

গণতন্ত্রে সবচেয়ে ভঙ্গুর পরিকাঠামো সম্ভবত ভোটার তালিকা। এই তালিকাই ঠিক করে, রাজনৈতিকভাবে কার অস্তিত্ব থাকবে আর কার থাকবে না। কার নাম থাকবে, কার নাম বাদ যাবে— এই সিদ্ধান্ত শুধু কাগজপত্রের বিষয় নয়, এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। তাই ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক কখনও নিছক প্রশাসনিক সমস্যা থাকে না, তা দ্রুত আস্থার পরীক্ষায় পরিণত হয়।

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ সেই রকমই এক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। রাজ্যে চলছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন)। উদ্দেশ্য— ভুল নাম বাদ দেওয়া, একই ব্যক্তির একাধিক নাম সরানো, পুরনো বা অচল তথ্য সংশোধন করা। শুনতে সাধারণ প্রশাসনিক কাজের মতো। কিন্তু বাস্তবে এটি রাজ্য সরকার ও জাতীয় নির্বাচনকমিশনের মধ্যে এক তীব্র টানাপোড়েনের রূপ নিয়েছে।

Advertisement

সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে আস্থা। সংবিধান নির্বাচন কমিশনকে বিস্তৃত ক্ষমতা দিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা কার্যকর করতে রাজ্য প্রশাসনের সহযোগিতা অপরিহার্য। কর্মী, তথ্য, পরিকাঠামো— সবই রাজ্যের মাধ্যমে সরবরাহ হয়। দুই পক্ষের মধ্যে যদি সন্দেহ ও অবিশ্বাস জন্মায়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই জটিল হয়ে ওঠে। ফাইল এগোয় না, সময়সীমা চাপ হয়ে দাঁড়ায়, আর সাধারণ নাগরিক দুশ্চিন্তায় পড়ে যান— তাঁর নাম আদৌ থাকবে তো?

Advertisement

এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত— জেলা বিচারক ও অতিরিক্ত জেলা বিচারকদের সরাসরি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার প্রস্তাব। বিচারকেরা সাধারণত আদালতেই থাকেন, নির্বাচন পরিচালনার প্রশাসনিক কাজে তাঁদের ডাকা খুবই অস্বাভাবিক। তাই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই পদক্ষেপ কি প্রয়োজনীয় ছিল?

তবে এটাও সত্য, এমন পদক্ষেপ হঠাৎ নেওয়া হয় না। যখন স্বাভাবিক সহযোগিতা ভেঙে পড়ে, তখনই অসাধারণ ব্যবস্থা নিতে হয়। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর হস্তক্ষেপ সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। কলকাতা হাই কোর্টের মাধ্যমে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের যুক্ত করার নির্দেশ আসলে এক ধরনের নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক নিয়োগ। উদ্দেশ্য— এই বার্তা দেওয়া যে, অন্তর্ভুক্তি বা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়, নথি ও আইনের ভিত্তিতে হবে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, সময় কি যথেষ্ট? সামনে নির্বাচন। লক্ষ লক্ষ দাবি ও আপত্তি জমে আছে। এমন অবস্থায় বিলম্ব গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর। যদি যোগ্য ভোটার কাগজপত্রের জটিলতায় হারিয়ে যান, তা হলে সেটি বড় অবিচার। আবার অযোগ্য নাম কেবল বিতর্কের ভয়ে রেখে দেওয়াও সঠিক নয়। সঠিক তালিকা তৈরির জন্য দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়া দরকার।

এই প্রেক্ষাপটে বিচারকদের উপস্থিতি হয়তো আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। তাঁদের নিরপেক্ষ অবস্থান সিদ্ধান্তকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে, আদালত প্রশাসনের বিকল্প নয়। দীর্ঘমেয়াদে নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে স্বাভাবিক ও বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্কই সবচেয়ে জরুরি।
এই ঘটনায় বড় শিক্ষা রয়েছে। গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে বুথে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার ভিত্তি গড়ে ওঠে তালিকা তৈরির মতো নীরব প্রক্রিয়ার উপর। যখন সেই প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত কেঁপে ওঠে। তখন সাধারণ কাজও অসাধারণ সাংবিধানিক পদক্ষেপ দাবি করে।

ভোটার তালিকা শুধু নামের খাতা নয়, এটি নাগরিকত্বের স্বীকৃতিও। তাই এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সংবেদনশীলতা ও দ্রুততা— তিনটিই অপরিহার্য। রাজনৈতিক মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু ভোটের অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া উচিত নয়।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ক্ষমতার নয়, বিশ্বাসের। যদি প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বজায় থাকে, তবে কঠিন কাজও সহজ হয়। আর যদি সেই আস্থা দুর্বল হয়, তবে সবচেয়ে সাধারণ নাগরিক কাজও হয়ে ওঠে জটিল ও ভারী। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি রাজ্যের প্রশাসনিক বিতর্ক নয়, এটি গণতান্ত্রিক আস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

Advertisement