পুলক মিত্র
প্রতীক উর রহমান। ডায়মন্ড হারবারের এক গরিব মুসলমান পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ নেতা সিপিএমের অন্দরমহলের কুৎসিত রাজনীতিকে একেবারে বেআব্রু করে দিয়েছেন। প্রতীক উর দলের ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের দুই মেয়াদের রাজ্য সভাপতি। সিপিএমের রাজ্য কমিটিতেও তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দল ছাড়ার সিদ্ধান্তে সিপিএমের এখন গভীর অস্বস্তিতে। দল ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরপরই তিনি সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমকে।
Advertisement
সেলিমও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাঁর বিরুদ্ধে যিনি মুখ খুলেছেন, সেই প্রতীক উর শুধুমাত্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নন, সেইসঙ্গে তিনি এক গরিব পরিবারের সন্তান। সংবাদমাধ্যমে তিনি সেলিমের বিরুদ্ধে যেসব বাক্যবাণ নিক্ষেপ করে চলেছেন, সাম্প্রতিক অতীতে তা কখনও দেখা যায়নি। তাঁর মতে, সিপিএমে এখন ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সেলিমের নেতৃত্বে চলা সিপিএমে প্রশ্ন করলে পদ খোয়া যায়, ‘ইয়েস স্যর’ বললে নেতা হিসেবে প্রমোট করা হয়।
Advertisement
দলের তরুণ মুখ সৃজন ভট্টাচার্যও সেলিমের কাজে খুশি নন। তবে প্রতীক উরের মতো তিনি প্রকাশ্যে কোনও বেফাঁস মন্তব্য করেননি। তরুণ ব্রিগেডের আরেক নেত্রী দীপ্সিতা ধর এখনও পর্যন্ত তাঁর সদস্য পদ পুনর্নবীকরণ করেননি। সিপিএমের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলীয় সদস্যপদ নবীকরণ হয় প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে। কিন্তু সাধারণ পার্টি সদস্যদের নবীকরণ জানুয়ারির মধ্যেই হয়ে যায়। তার পরে তা জেলা স্তরে যায় অনুমোদনের জন্য।
যদিও দীপ্সিতার দলীয় সদস্যপদ পশ্চিমবঙ্গে নয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলেন তিনি। সেই সুবাদে তাঁর দলীয় সদস্যপদও দিল্লিতে। দীপ্সিতা অবশ্য জানিয়েছেন, তাঁর সদস্য পদ নবীকরণের জন্য তাঁকে দিল্লি যেতে হবে ৷ তবে সদস্য পদ নবীকরণ না করার খবরটি সংবাদমাধ্যমে কী করে জানাজানি হল, তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এই নেত্রী। ২০১৮ সাল থেকে দীপ্সিতার সদস্যপদ কোনও শাখায় নেই। গত বছর জুলাই মাসের পরে তাঁর কোনও গণসংগঠনও নেই। এ হেন পরিস্থিতিতে তিনি গোটা বিষয়টিতে ‘ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত’।
বিধানসভার ভোটে দীপ্সিতাকে হুগলির উত্তরপাড়ায় দাঁড় করানো হবে, এমনটাই মনে করা হয়েছিল। বিগত লোকসভা নির্বাচনে দীপ্সিতা শ্রীরামপুর কেন্দ্রে প্রার্থী ছিলেন। উত্তরপাড়া বিধানসভা শ্রীরামপুর লোকসভা কেন্দ্রের অধীন। এখানকার সাতটির মধ্যে একমাত্র উত্তরপাড়া বিধানসভাতেই দীপ্সিতা সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। সংখ্যায় যা ৫০ হাজারেরও বেশি। কিন্তু সিপিএমের সিদ্ধান্ত বদলেছে। উত্তরপাড়ায় লড়বেন যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়।
দলে অনেক বিতর্কের পর মহম্মদ সেলিমকে রাজ্য সম্পাদক করা হয়েছিল। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, এতে আগামী দিনে সিপিএমের আদৌ কোনও রাজনৈতিক লাভ হবে কি? সেলিমের নেতৃত্ব কি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারবে? কিংবা সিপিএম কি হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে পারবে? সেলিমকে নেতা করে সিপিএম এক ঢিলে অনেকগুলি পাখি মারার কৌশল নিয়েছিল। যেমন, এক, সেলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাই যে সংখ্যালঘু শ্রেণি সিপিএমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আবার তাদের আস্থা অর্জন করা। দুই, সিপিএম সংখ্যালঘু কাউকে শীর্ষ নেতৃত্বের পদে বসায় না, এই অপবাদও দূর করা। তিন, তুলনামূলকভাবে সেলিমের বয়স কম। তাই তিনি দৌড়ঝাঁপ করতে পারবেন। ঘরে বসে আন্দোলন করবেন না। চার, ছাত্র-যুব আন্দোলন করেছেন। তাই জেলা থেকে শহর, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর ভালো যোগাযোগ রয়েছে। পাঁচ, সেলিম ভালো বক্তা। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, তিন ভাষাতেই স্বচ্ছন্দ।
কিন্তু একমাত্র সুবক্তা ছাড়া, অন্য সবকটি ক্ষেত্রেই সেলিম চরমভাবে ব্যর্থ। সেলিম সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেননি। বৃদ্ধতন্ত্র সরিয়ে যে তরুণ নেতৃত্বের ওপর ভর করে সিপিএম আবার জমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছিল, তা ক্রমশ বিলীন হতে চলেছে। তার ওপর দলত্যাগী তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে সেলিমের সাম্প্রতিক বৈঠক ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। কারণ, রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক থেকে হুমায়ূন পুরোপুরি বিপরীত ভাবনায় বিশ্বাসী। তাঁর মতো একজন ‘মুসলিম’ নেতার সঙ্গে সেলিম কী করে বৈঠক করলেন, তা নিয়ে সিপিএমের অন্দরেও বিতর্ক চলছে।
গত বিধানসভার ভোটে আব্বাস সিদিক্কির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট-এর সঙ্গে জোট গড়েছিল সিপিএম। আইএসএফ-কে জোটে নেওয়ার প্রবল বিরোধিতা করেছিল সেই সময়ের জোটসঙ্গী কংগ্রেস। আপত্তি জানিয়েছিলেন দলের নেতাদের একটা বড় অংশ। বিরোধিতা করেছিলেন বামফ্রন্টের শরিক দলের নেতারাও। শেষ পর্যন্ত সেলিমের চাপেই আব্বাসের সঙ্গে জোট করতে বাধ্য হয়েছিল সিপিএম। কিন্তু ভোটের ফল বেরোতেই দেখা যায়, বিধানসভায় বামেদের আসন শূন্যে নেমে এসেছে। আব্বাসের দল জিতেছে একটি আসনে। অর্থাৎ আব্বাসকে সঙ্গে নিয়ে সংখ্যালঘু ভোট টানার যে কৌশল নেওয়া হয়েছিল, তা কাজে আসেনি। সংখ্যালঘুদের বিপুল সমর্থন গেছে তৃণমূলের দিকেই।
ভোটে বিপর্যয়ের পরই দলের নেতাদের একাংশের তোপের মুখে পড়তে হয় সেলিমকে। তাঁকে নিশানা করে বিভিন্ন মঞ্চে আক্রমণ শানাতে থাকেন তন্ময় ভট্টাচার্য-সহ দলের একাধিক নেতা। ব্রিগেডের সভায় সেলিমের সঙ্গে আব্বাসের গলাগলি নিয়েও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তন্ময়। শেষ পর্যন্ত বিক্ষুব্ধদের মুখ বন্ধ করতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্দেশ জারি করতে হয়। সতর্ক করা হয় তন্ময়কে।
দলের সম্পাদক কে হবেন, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল চরম দোদুল্যমানতা। কাকে সম্পাদক করা হবে, তা নিয়ে দলের রাজ্য সম্মেলনে কম বিতণ্ডা হয়নি। ওই পদে আর যাঁরা দাবিদার ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন, শ্রীদীপ ভট্টাচার্য, সুজন চক্রবর্তী, শমীক লাহিড়ী। তবে এঁরা কেউই পলিটব্যুরো সদস্য নন। তাই দৌড়ে এগিয়েই ছিলেন পলিটব্যুরো সদস্য সেলিম। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাঙার পর থেকে যাঁরাই সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন।
এখানে আরেকটি তথ্য তুলে ধরা দরকার। তা হল, অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে ১৯৫১ সালে কিছুদিনের জন্য প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক পদে ছিলেন মুজফফর আহমেদ, যিনি কাকাবাবু নামে বেশি পরিচিত। তার আগে ১৯৪৯-৫০ সালে প্রাদেশিক কমিটির সম্পাদক ছিলেন শ্রমিক নেতা মহম্মদ ইসমাইল। সেদিক থেকে দেখলে, ‘কাকাবাবু’র পরে কোনও মুসলমান নেতা সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক হননি। ঘুরিয়ে বললে, বলা যায়, ওই পদে মুসলিম কাউকে বসানোর কথা ভাবা হয়নি।
অথচ এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। দেশে বাম আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কাকাবাবু ও আব্দুল হালিমের অনেক অবদান থাকলেও, গোটা কমিউনিস্ট পার্টিতেই কখনও মুসলমানদের তেমন করে নেতত্বে তুলে আনা হয়নি। প্রায় ১০০ বছর আগে দেশে কমিউনিস্ট পার্টির আত্মপ্রকাশের সময় মুসলিমরাই ছিলেন সামনের সারিতে। অথচ অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টিতে, কিংবা পার্টি ভাঙার পরে মুজফফর আহমেদ কখনও পলিটব্যুরো সদস্য হতে পারেননি।
এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সিপিএমকে কটাক্ষের মুখেও পড়তে হয়েছে। দলের মধ্যে বরাবরই ব্রাহ্মণ বা কায়স্থদের দাপট দেখা গেছে, যা থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি সিপিএম। সিপিএমে প্রথম মুসলিম পলিটব্যুরো সদস্য হয়েছিলেন মহম্মদ আমিন। এটাও সম্ভব হত না, যদি না তিনি সিটুর সর্বভারতীয় সম্পাদক না হতেন।
২০১১ সালের জনগণনার তথ্য অনুযায়ী, এই রাজ্যে মুসলিমদের হার প্রায় ২৭ শতাংশ। আর সিপিএমের সদস্যদের মধ্যে মুসলিম রয়েছেন মাত্র ১৬.৪৭ শতাংশ। দলীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য বলছে, ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের সদস্য সংখ্যা ছিল ১,৬০,৪৮৫ জন। এর মধ্যে মুসলিম হলেন মাত্র ২৬,০৩২ জন। ২০১১ সালে সিপিএমের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সময় বাংলায় দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষের বেশি।
২০১৮ সালে ২৫তম রাজ্য সম্মেলনের সময় এই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৮৪ হাজার ৭৪০-এ। ২০২১ সালে পুনর্নবীকরণের পরে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৮২০তে। গত সম্মেলনের পর দলের সদস্য কমেছে ২৪ হাজারের মতো। আসলে সিপিএম দলটা এই মুহূর্তে এক চরম রাজনৈতিক দৈন্যের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সেলিম জমানায় সিপিএমের শক্তি তো বাড়েইনি, বরং শূন্য সিপিএম যেন মহাশূন্য হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। তার ওপর খোদ রাজ্য সম্পাদকের বিরুদ্ধে তরুণ ব্রিগেডের বিধানসভা ভোটের মুখে সিপিএমকে যে আরও বিড়ম্বনায় ফেলবে, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
Advertisement



