• facebook
  • twitter
Saturday, 7 March, 2026

নকল বিশ্ববিদ্যালয়! শিক্ষার শীর্ষে এই লজ্জা কেন?

চাকরির দরজায় ধাক্কা খেয়ে তিনি দাঁড়ান শূন্য হাতে। আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, পরিবার বিপর্যস্ত হয়, আর সমাজে জন্ম নেয় হতাশা ও ক্ষোভ।

প্রতীকী চিত্র

নিশীথ সিংহ রায়

সম্প্রতি চোখে পড়ল একটা খবর যে, ভারতে বত্রিশটি নকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব সম্বন্ধে ইউজিসি ভারতবাসীকে সাবধান করেছে। শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তরে এই যদি অবস্থা হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাচ্ছে? এই প্রশ্নই আমার বিবেকের দর্শন করল তাই এটা নিয়ে লিখলাম।
‘বিশ্ববিদ্যালয়’ এই শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাস, মর্যাদা, সম্ভাবনা ও জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ চারণক্ষেত্র। জ্ঞানচর্চার সর্বোচ্চ সেই বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই ‘ফেক’। একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু যে ডিগ্রি দেওয়ার কারখানা নয় এটাই আমরা ভুলে যাই। আর শিক্ষা মানে শুধু যে পুঁথিগত বিদ্যা নয়, তা জীবন চলার পথের পাথেয় সেটাও আমরা ভুলে যাই। আর সেই পথের সর্বোচ্চ ক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় মানে যে গবেষণা, মুক্তচিন্তা, সমালোচনার অধিকার বা জাতির বৌদ্ধিক ভিত গড়ে তোলার চারণক্ষেত্র এটাই আমরা ভুলে গেছি। তাই তো শীর্ষস্থানেই নকলের অবাধ কারবার চলে। এটা বলে রাখা ভালো এটা যে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রের ব্যর্থতা তা কিন্ত নয় রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াপনারও ইঙ্গিত। ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের নিয়ম-কানুন স্পষ্ট।

Advertisement

কেন্দ্রীয় আইন, রাজ্য আইন বা সংসদের বিশেষ অনুমোদন ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে পারে না। এই তদারকির দায়িত্বে রয়েছে ইউজিসি। তবুও প্রশ্ন উঠছে যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, আইন আছে এবং তা দেখার পরিকাঠামো বা তদারকি আছে, তা সত্ত্বেও এত নকল বিশ্ববিদ্যালয় মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কীভাবে? একটা-দুটো নয়, দেখলাম ভারতে বত্রিশটা নকল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাক্ষেত্রে তাদের জাল বিস্তার করে সার্টিফিকেটপিপাসু শিক্ষার্থীদের ঠকিয়ে যাচ্ছে। তাদের নাম, ঠিকানা সব নেট খুললেই পেয়ে যাবেন। আমি এখানে শুধু কোন রাজ্যে কয়টি তার তালিকা দিয়ে দিলাম। অন্ধ্রপ্রদেশে দুটি, অরুণাচল প্রদেশে একটি, নিউ দিল্লি ও বৃহত্তর দিল্লিতে মোট বারোটা, হরিয়ানা একটা, ঝাড়খণ্ড একটা, কর্নাটকে দুটো, কেরালা দুটো, মহারাষ্ট্র দুটো, পুদুচেরি দুটো, রাজস্থান একটা, উত্তরপ্রদেশ চারটে এবং পশ্চিমবঙ্গে দুটো। কেন এমন হচ্ছে?

Advertisement

উত্তরটা অস্বস্তিকর হলেও সত্য চাহিদা ও অবহেলার যুগলবন্দি। ভারতের জনসংখ্যা বিপুল, উচ্চশিক্ষার চাহিদা আরও বিপুল। সরকারি ও স্বীকৃত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আসন সীমিত। এই ফাঁকটুকুই সুযোগ হিসেবে নেয় অসাধু চক্র। তারওপর আছে কিছু টাকা দিয়ে নিজের নামের পাশে একটা ডিগ্রি যোগ করার প্রবণতা। তাই এই নকল বিশ্ববিদ্যালয়গুলি চকচকে ওয়েবসাইট, আকর্ষণীয় নাম, দ্রুত ডিগ্রির প্রলোভন সব মিলিয়ে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করেছে। আর এই বাজারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকার ছাত্রছাত্রীরা, যাঁদের তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত। নকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, সামাজিকও। একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর সময় ও অর্থ ব্যয় করে শেষে জানতে পারেন তাঁর ডিগ্রির কোনও বৈধতা নেই।

চাকরির দরজায় ধাক্কা খেয়ে তিনি দাঁড়ান শূন্য হাতে। আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, পরিবার বিপর্যস্ত হয়, আর সমাজে জন্ম নেয় হতাশা ও ক্ষোভ। এই ক্ষত কি কোনও পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায়?
এখানেই প্রশ্ন ওঠে প্রশাসনিক জবাবদিহির। ইউজিসি সময়ে সময়ে সতর্কতামূলক তালিকা প্রকাশ করে, বিজ্ঞপ্তি দেয় এ কথা সত্য। কিন্তু তালিকা প্রকাশই কি যথেষ্ট? একটি নকল বিশ্ববিদ্যালয় বছরের পর বছর কীভাবে বিজ্ঞাপন দেয়, ভর্তি নেয়, পরীক্ষা চালায়। এত কিছু হওয়ার পরেও যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে তা নিছক অজ্ঞতা নয়, বরং প্রশাসনিক গাফিলতি। কখনও কখনও স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা, কখনও বা রাজনৈতিক প্রশ্রয় এসব মিলিয়েই নকলের শিকড় আরও গভীরে চলে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সমাজের মানসিকতা। আমরা কি ডিগ্রির পেছনে ছুটি, না শিক্ষার পেছনে? দ্রুত সার্টিফিকেট, কম খরচে বড় নাম এই লোভই প্রতারকদের শক্তি জোগায়। শিক্ষাকে যদি কেবল চাকরির টিকিট হিসেবে দেখা হয়, তবে শিক্ষার মান, স্বীকৃতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রবণতা কমে যায়। এই মানসিক পরিবর্তন না হলে নকল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা কঠিন।

তবে সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতা ও সক্রিয়তা বাড়াতে হবে। নকল প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে কেবল তালিকাভুক্তি নয়, তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জরুরি। দ্বিতীয়ত, রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে কারণ শিক্ষার প্রশ্নে দায় এড়ানোর সুযোগ থাকা চলবে না।

তৃতীয়ত, ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার আগে তার স্বীকৃতি যাচাই করা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়। বর্তমান সমাজ মাধ্যমের যুগে যা করা অসম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষাকে আবার মর্যাদার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মানে যেন আবার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়, মুনাফার নয়। রাষ্ট্র যদি শিক্ষাকে কেবল বাজেটের খাতে দেখে, আর সমাজ যদি শিক্ষাকে কেবল চাকরির সিঁড়ি ভাবে, তবে এই সংকট চলতেই থাকবে।
এই লেখা শেষ করতে গিয়ে আবার সেই ব্যক্তিগত প্রশ্নে ফিরে এলাম। এভাবে লিখে কি কোনও কাজ হয়? হয়তো তৎক্ষণাৎ হয় না। কিন্তু প্রশ্ন তোলা, অসঙ্গতি দেখানো, বিবেককে নাড়া দেওয়াটাও তো লেখার কাজ। নকল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কেলেঙ্কারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে শিক্ষার শীর্ষে যে ফাটল ধরেছে, তা উপেক্ষা করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। আজ কলম থামালে কাল হয়তো প্রশ্ন করার অধিকারও হারাব। তাই লিখতেই হয়।

Advertisement