সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরের দিনই তৎপরতা দেখা গেল কলকাতা হাইকোর্টে। শনিবার হাইকোর্টে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় তথ্যগত অসঙ্গতি খতিয়ে দেখতে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা বলেছিল শীর্ষ আদালত।
সেই কমিটিতে কারা থাকবেন, তা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় হাইকোর্টকে। নির্দেশ মেনে শনিবার বিকেলে বৈঠকে বসেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। উপস্থিত ছিলেন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী ও মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল-সহ শীর্ষ প্রশাসনিক কর্তারা। অন্যদিকে বিধানসভা ভোটের দিনক্ষণ নিয়ে চর্চার মধ্যেই সোমবার উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক ডাকল মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর।
Advertisement
সূত্রের খবর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এসআইআরের বাকি কাজ বিচারবিভাগীয় তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করার রূপরেখা তৈরিই ছিল বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য। নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের আধিকারিকেরা বিচারবিভাগীয় প্রতিনিধিদের সহায়তা করবেন।
Advertisement
রাজ্যের ২৩টি জেলায় ভোটার তালিকায় এসআইআর প্রক্রিয়ায় গতি আনতে জেলা বিচারকদের অধীনে প্রায় ১৫ জন অতিরিক্ত জেলা বিচারক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে খবর। শনিবার অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ নিয়ে নীতিগত ঐকমত্য গড়ে উঠেছে বলে সূত্রের খবর। পাশাপাশি সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য হাইকোর্টের সাত জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে নিয়ে একটি পর্যবেক্ষক কমিটি গঠনের প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
এই বৈঠকে এসআইআর শুনানির কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও মাননির্ধারিত প্রক্রিয়া (এসওপি) তৈরির রূপরেখা চূড়ান্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। নিযুক্ত বিচারকদের জন্য রাজ্য জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমিতে দু’দিনের প্রশিক্ষণের প্রস্তাবও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের এক কর্তা জানিয়েছেন, জেলা ও বিধানসভা-ভিত্তিক সমস্ত তথ্য সরবরাহ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেওয়া হবে। তাঁর কথায়, ‘কোনও যোগ্য ভোটার যেন বাদ না যান—সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে।‘ কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরাই শুনানি পরিচালনা করবেন। প্রায় ১৫০ জন সেশন বিচারক এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে পারেন।
তবে বৈঠকে কিছু মতপার্থক্যও দেখা যায়। সাত জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নাম নিয়ে প্রথমে আপত্তি ওঠে। কারণ তাঁদের মধ্যে পাঁচ জন অবসরের পর রাজ্যের বিভিন্ন কমিটিতে যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ। প্রধান বিচারপতি পূর্বনির্বাচিত সাতটি নামেই শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেন।
শুক্রবার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেই মত দেয় আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরকে ঘিরে ‘ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, হাইকোর্ট বর্তমান বিচারক ও অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলা বিচারকদের নিয়োগ করবে। প্রতি জেলায় কয়েক জন করে আধিকারিক থাকবেন এবং তাঁরা ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। কমিশন, রাজ্য প্রশাসন, পুলিশ ও আইন আধিকারিকদের নিয়ে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার দিকেই এখন নজর।
অন্যদিকে বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার আগেই বঙ্গে আসছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কমিশন সূত্রে খবর, ১ মার্চ থেকে ধাপে ধাপে আধাসেনা নামানো হবে রাজ্যে। প্রথম দফায় ২৪০ কোম্পানি বাহিনী পৌঁছবে, দ্বিতীয় দফায় ১০ মার্চ আসবে আরও ২৪০ কোম্পানি—সব মিলিয়ে মোট ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কোন জেলায় কত বাহিনী থাকবে, তাদের রুট মার্চ, স্ট্রাইকিং পয়েন্ট ও আবাসনের ব্যবস্থা—এসব চূড়ান্ত করতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ডেকেছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর। আগামী সোমবার বিকেল চারটেয় কলকাতায় এই বৈঠক হওয়ার কথা।
বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগারওয়াল-সহ দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা। পাশাপাশি থাকবেন বিশেষ পর্যবেক্ষক এন কে মিশ্র, রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতা পুলিশের কমিশনার, এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা), রাজ্য পুলিশের নোডাল অফিসার এবং সিআইএসএফের নোডাল আধিকারিকরা। নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রস্তুতি আরও জোরদার করতেই এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
Advertisement



