সৈয়দ হাসমত জালাল
দ্বিতীয় পর্ব
Advertisement
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে। দীর্ঘদিন রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিতর্কের মধ্যে থাকা এই দলটি এবার নিজেদের নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা করছে— শুধু ধর্মীয় দল হিসেবে নয়, বরং একটি নৈতিক ও সংস্কারমুখী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে। প্রশ্ন উঠছে, জামায়াত কী বার্তা দিচ্ছে, মানুষ সেই বার্তায় কতটা সাড়া দিচ্ছে।
Advertisement
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারের মূল অভিমুখ কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর দাঁড়িয়ে। প্রথমত, তারা দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। তাদের নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ক্ষমতার রাজনীতি লুটপাট ও স্বজনপ্রীতিতে ডুবে গিয়েছে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনা হবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা করা হবে— এই প্রতিশ্রুতি তারা প্রায় সব সভা-সমাবেশেই তুলে ধরছে।
দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থান ও যুবসমাজ জামায়াতের প্রচারের একটি বড় অংশ। তারা দাবি করছে, দেশের বিপুল বেকার তরুণ-তরুণী বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ দেখছে না। এই জায়গায় জামায়াত প্রশিক্ষণ, আত্মকর্মসংস্থান ও জেলা-ভিত্তিক চাকরি ব্যবস্থার কথা বলছে। তরুণদের কাছে তারা নিজেদের ‘বিকল্প’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে, যে শক্তি পুরনো দলগুলির বাইরে দাঁড়িয়ে নতুন পথ দেখাতে পারে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হল নারী ও পরিবার। জামায়াতে ইসলামী বলছে, তারা নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং নারীশিক্ষা ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে চায়। তবে এখানেই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতাদের একাধিক বক্তব্যে নারীর কর্মজীবন ও নেতৃত্ব নিয়ে রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, যা বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ফলে একদিকে জামায়াত নারীসমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সেই প্রচেষ্টাই তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এ ছাড়া জামায়াত তাদের রাজনৈতিক প্রচারে ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তার প্রশ্নও সামনে আনছে। তারা বলছে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের স্বীকৃতি সংবিধানগতভাবে দিতে হবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘নৈতিক শাসন’ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারা একদিকে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করছে, অন্যদিকে নিজেদের একটি আলাদা আদর্শগত অবস্থানে দাঁড় করাতে চাইছে।
তবে এই প্রচারে জনসাধারণের সাড়া একরকম নয়। কিছু এলাকায়, বিশেষ করে শহরের প্রান্তিক অঞ্চল ও রাজনৈতিকভাবে হতাশ তরুণদের মধ্যে জামায়াতের সভা-সমাবেশে ভিড় দেখা যাচ্ছে। সমাজমাধ্যমে তাদের বক্তব্য কিছু অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী ভাষার কারণে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বন্দ্বে ক্লান্ত, তাদের একাংশ জামায়াতের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকাচ্ছে।
অন্যদিকে, বিরোধিতাও কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এখনও মানুষের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। বিএনপি-সহ একাধিক দল প্রকাশ্যে বলছে, জামায়াত ইতিহাস বিকৃত করে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে। নারী অধিকার ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নেও জামায়াতের অবস্থান বহু ভোটারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফলে তাদের সমর্থন যেমন আছে, তেমনই শক্ত বিরোধিতাও রয়েছে।
জোটরাজনীতির প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামী স্পষ্টভাবে বলছে, তারা বড় কোনও স্থায়ী জোটে নেই। তবে বাস্তবে তারা একাধিক ছোট দল ও ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করেছে। আসন ভাগাভাগি করে কোথাও নিজেরা প্রার্থী দিয়েছে, কোথাও মিত্র দলকে সমর্থন করছে। এই সমঝোতার লক্ষ্য একটাই— সংসদে উপস্থিতি বাড়ানো এবং রাজনৈতিক দরকষাকষিতে জায়গা করে নেওয়া। তবে এই জোটগুলি এখনও দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রেই মতভেদ ও ভাঙনের ছবি দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে নিজেদের নতুনভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। তারা দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও নৈতিকতার কথা বলছে, কিন্তু অতীতের ভূমিকা ও বর্তমান রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি তাদের পিছু ছাড়ছে না। জনসমর্থন সীমিত হলেও একেবারে নগণ্য নয়। নির্বাচন যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে— এই প্রচার জামায়াতকে সত্যিই নতুন রাজনৈতিক জায়গা করে দিতে পারে, নাকি তারা এবারও বিতর্ক ও বিরোধিতার মধ্যেই আটকে থাকবে।
Advertisement



