মাদক চালানের অভিযোগে রাতের অন্ধকারে হামলা চালিয়ে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ। তারপরে আর মাদক পাচারের কথা না বলে সরাসরি সেই দেশ ও তার তেল নিয়ন্ত্রণে আনার ঘোষণা। এরপরেই আরও কয়েকটি দেশ দখলের হুমকি। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, এ যেন অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া, যাকে আটকালে যুদ্ধ করতে হবে আর না আটকালে দেশটা পদানত হবে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প রেখেঢেকে কাজ করেন কম। তিনি যে, কোনও দেশের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসঙ্ঘকে পরোয়া করেননা, বারে বারে তার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন।
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে অপহরণ করার কারণ হিসেবে মার্কিন সরকার বলেছিল মাদক পাচারের কথা। এরপর ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলা ও তার খনিজ তেলকে আমেরিকাই নিয়ন্ত্রণ করবে। ভেনেজুয়েলা থেকে আমেরিকা কত ব্যারেল তেল কিনবে সেটাও বলে দিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে এটা জানাতে ভোলেননি যে, তেলের অর্থ ভেনেজুয়েলার সরকারকে এখনই দেওয়া হবে না, আমেরিকাই রেখে দেবে। পরে ‘ভেনেজুয়েলার স্বার্থে’ খরচ করা হবে।
Advertisement
যেন ভেনেজুয়েলা স্বাধীন কোনও দেশ তো নয়ই, এমনকি আমেরিকার কোনও প্রদেশও নয়। সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনস্থ ভূখণ্ড।অথচ রাষ্ট্রপতি বন্দি হওয়ার পরেও, ভেনেজুয়েলায় সরকারের পতন ঘটেনি। অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন উপ রাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগেজ। ডেলসি শপথ নিয়েই ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় লড়াই জারি রাখার অঙ্গীকার করেছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকেই ক্যারিবীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ভেনেজুয়েলার একের পর এক জলযানে আমেরিকা হামলা চালাতে শুরু করে। তেলবাহী ট্যাঙ্কার দখল করে।
Advertisement
দেশটাকে ভাতে মারতে সমুদ্রপথ অবরোধ করে। যার চূড়ান্ত পরিণতি নববর্ষে দেখল তামাম দুনিয়া। ১৯৯৯ সালে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে উগো শ্যাভেজ ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর থেকেই দু’দেশের সম্পর্ক তলানিতে। শ্যাভেজ তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসায় আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলি চটে যায়। তেল বেচার অর্থে সামাজিক কল্যাণের জন্য সরকারের খরচ বৃদ্ধি, একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের স্লোগান আমেরিকা কখনই মেনে নেয়নি। আই এম এফ, বিশ্বব্যাঙ্ক, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার দাপট থেকে মুক্ত হতে কিউবা, ভেনেজুয়েলা লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দেশগুলিকে নিয়ে জোট গড়ার তোড়জোড় করে। এত ‘অনাচার’ সহ্য হয়! প্রাকৃতিক সম্পদ যাবে বড় বড় কোম্পানির দখলে, দুনিয়া জুড়ে পুঁজি দাপিয়ে বেড়াবে আর সব দেশের গুরুঠাকুর হবে আমেরিকা– একেই তো বলে ‘সুশাসন’।
ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তেল মজুত রয়েছে। তার দখল চাই। তাই প্রথমে ভেনেজুয়েলাকে ভাতে মারতে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি করল আমেরিকা। ততদিনে শ্যাভেজের মৃত্যু হয়েছে, মাদুরো রাষ্ট্রপতি হয়ে গেছেন। আমেরিকা সম্পর্ক নষ্ট করায়, স্বাভাবিকভাবেই চিন, রাশিয়া-সহ নানা দেশে তেল বেচার ওপর গুরুত্ব দিল ভেনেজুয়েলা। মাদুরো এখানেই থামলেন না। ২০১৮ সালে ডলারের বদলে ইউয়ান, ইউরো, রুবলে তেল বেচার কথা ঘোষণা করেন। বিশ্বে অপরিশোধিত তেলের কেনাবেচা হয় মূলত মার্কিন ডলারে। যে ব্যবস্থা বিশ্বের মুদ্রা বাজারে আমেরিকার দাপটের বড় হাতিয়ার। সেটাকেই চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বসলেন মাদুরো। এদিকে ভেনেজুয়েলায় চিনের প্রভাব বাড়তে থাকল। তেল কেনা বন্ধ করার অস্ত্র আমেরিকার কাছে ব্যুমেরাং হয়ে ফিরল।
শুধু কি তেল? ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কেই নাকি ১৬১ মেট্রিক টন সোনা রয়েছে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ২২০০ কোটি ডলার। মাটির তলায় রয়েছে বিপুল পরিমাণ সোনা-হীরে, তামা, নিকেল, দস্তা, লিড, বক্সাইটের মতো মহার্ঘ খনি ও বিরল মৃত্তিকার (রেয়ার আর্থ) উপাদান। রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, আকরিক লোহা। এসবেরই একচেটিয়া দখল চায় আমেরিকার কোম্পানিগুলি। শুধু ভেনেজুয়েলা নয়। লাতিন আমেরিকার সব দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দখলে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় আমেরিকা। রিপাব্লিকান বা ডেমোক্র্যাট যে দলের প্রার্থীই আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হন না কেন, সেই আগ্রাসন নীতি বিশেষ বদলায় না।
ভেনেজুয়েলায় হামলার পরেই ট্রাম্প কিউবা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, গ্রিনল্যাণ্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন। গ্রিনল্যাণ্ডে রয়েছে ২৫ রকমের মহার্ঘ খনি। রয়েছে বিভিন্ন বিরল মৃত্তিকার উপাদান। সেগুলি দখলই আমেরিকার আসল লক্ষ্য। তথ্য প্রযুক্তি, ব্যাটারি চালিত যান, বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে এইসব মহার্ঘ খনি ও বিরল মৃত্তিকার আর্থিক গুরুত্ব বেড়ে চলেছে। বিরল মৃত্তিকা সবচেয়ে বেশি রয়েছে চিনের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বের বিরল মৃত্তিকা খননের ৬০ শতাংশই করে চিন। আগামীদিনে এর দখলদারি নিয়ে বড়সড় যুদ্ধের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
গ্রিনল্যাণ্ড দখলের হুমকিতে ন্যাটোর অভ্যন্তরেও শুরু হয়েছে দ্বন্দ্ব। প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের এই প্রতিযোগিতা ভূ-রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।ভারতও কি এই অবস্থায় নিরাপদ? আরাবল্লী পর্বত, লাদাঘ বা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মহার্ঘ ও বিরল খনির ওপরেও তো বড় বড় কোম্পানির নজর পড়েছে। তাই লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবি তুলে কারাবন্দি সোনম ওয়াংচুক। অন্য দেশ দখল, যুদ্ধ সবই হয় স্বদেশের নিরাপত্তার অজুহাতে। সেই অজুহাতে যে চিঁড়ে ভিজছে না, তা খোদ আমেরিকার রাজপথে মানুষের বিক্ষোভেই স্পষ্ট।
Advertisement



