সুইৎজারল্যান্ডের দাভোসে জানুয়ারি ১৯ থেকে ২৩ তারিখের মধ্যে বসেছিল ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর বৈঠক।সেই বৈঠকের সব আলো শেষমেশ কেড়ে নিয়ে গেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোলাল্ড ট্রাম্প – এর বক্তৃতা, ইউরোপের নেতাদের আমেরিকার সঙ্গে লেজুড় হয়ে থাকার হীন মনোবৃত্তি এবং বিশ্বের বাঘা বাঘা প্রায় চারশো ধনকুবেরদের লেখা একটি খোলা চিঠি।
আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ‘ম্যাডম্যান থিয়োরি’-র পথই কি নিয়েছেন ট্রাম্প? কিন্তু প্রতিপক্ষের উপর সুবিধা অর্জনের জন্য অনিয়মিত বা অপ্রচলিত আচরণের কৌশলগত ব্যবহার,(নিক্সনের ম্যাডম্যান থিয়োরি) আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেপরোয়া আচরণের দ্বারা বিশ্বাসে আঘাত করার মধ্যে পার্থক্য আছে। তাঁর সময়ে একাধিক অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক চাপ এই কৌশলের মাধ্যমে সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন নিক্সন।
Advertisement
কিন্তু যে বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ইতিমধ্যেই বিদ্যমান, সেখানে এই কৌশলের প্রয়োগ পরিস্থিতি জটিলতর করে। ট্রাম্পের কাজকর্মে প্রমাণিত, প্রভাব ফলানোর একমাত্র পথ হুমকি এবং বলপ্রয়োগ বলেই তাঁর বিশ্বাস। গ্রিনল্যান্ড সঙ্কট তাই কোথায় পৌঁছয়, দেখার জন্য এখন গোটা বিশ্বই উৎকণ্ঠিত।তাঁর নির্দেশে মার্কিন ফৌজ গ্রিনল্যান্ড দখল করতে পারে বলে আশঙ্কা ইউরোপ জুড়ে। তিনি স্বয়ং একাধিক বার তেমনটাই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
Advertisement
কিন্তু দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)-এর বৈঠকে মার্কিন ফৌজ দিয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলের সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট! কিন্তু সেই সঙ্গেই তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে গ্রিনল্যান্ডকে ‘আমাদের অঞ্চল’ বলে চিহ্নিত করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন ডেনমার্ক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের দাবি ছাড়বে না ওয়াশিংটন। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্প বলেন যে, মানুষ ভেবেছিলেন তিনি বলপ্রয়োগ করবেন!
কিন্তু তাঁকে বলপ্রয়োগ করতে হবে না। তিনি নাকি বলপ্রয়োগ করতে চান না,এবং বলপ্রয়োগ করবেন না। কিন্তু সেই সঙ্গেই তাঁর সতর্কবার্তা— আমেরিকা ছাড়া অন্য কোনও দেশ ডেনমার্ক নিয়ন্ত্রিত ওই ভূখণ্ড (গ্রিনল্যান্ড) সুরক্ষিত রাখতে পারবে না। এই পরিস্থিতিতে ‘গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ’ সংক্রান্ত আলোচনার জন্য অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলোচনা শুরু করার সওয়াল করেছেন তিনি।
এই আলোচনার আহ্বানকে ট্রাম্প-সুলভ ভাষায় চিহ্নিত করেছেন, ‘বরফের টুকরো সম্পর্কে ছোট অনুরোধ’ বলে। তাঁর আক্ষেপ, তিনি বিশ্ব সুরক্ষার জন্য এক টুকরো বরফ চাইছেন, কিন্তু কেউ তা দিচ্ছে না। দাভোসে ট্রাম্পের বক্তৃতায় এসেছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজ়া প্রসঙ্গও। তিনি বলেছেন যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জ়েলেনস্কির সঙ্গে তাঁর কথা চলছে।তিনি আশাবাদী। এবং, যুদ্ধবিরতির জন্য একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তি সম্পাদনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছেন,বলে তাঁর দাবি।
প্যালেস্টাইনি ভূখণ্ড গাজ়ার শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জঙ্গিগোষ্ঠী হামাসকে অস্ত্র ছাড়তে হবে বলেও স্পষ্ট জানান তিনি। দাভোসে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি কয়েক জন ইউরোপীয় নেতার ‘কঠোর না হওয়ার’ বিষয়ে অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, এই নেতাদের ‘কিছুটা মেরুদণ্ড থাকা উচিত’। কেউ বলতে পারেন যে, ইউরোপের সমস্যাটি কেবল সক্ষমতার অভাব নয়, এটি উদ্ভূত আমেরিকার উপরে অতিনির্ভরশীলতার মানসিকতা থেকে।
সেই কারণে এ-যাবৎ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করার সময়, অন্তর্বর্তী দ্বন্দ্ব এবং আশঙ্কার পুনরুত্থান বার বার থমকে দিয়েছে ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রচেষ্টাকে। এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভাঙন মেরামত করা কঠিন হয়ে উঠছে, জাগরণের এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ইউরোপ। মুষ্টিমেয় ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যা সাম্প্রতিক কালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে যথেষ্ট স্পষ্ট।
ইউরোপকে সামরিক ও অর্থনৈতিক, উভয় দিক থেকেই আরও স্বাধীন ভাবে কাজ করতে সক্ষম হতে হবে— ডাচ প্রধানমন্ত্রী ডিক স্কুফের এ-হেন বক্তব্য তারই ইঙ্গিতবাহী।বাস্তবিকই, ইউরোপ এখন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি— ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অস্থিরতার মাঝে আগামী দিনেও সে আমেরিকার শরণাপন্ন থাকবে, না কি এক স্বাধীন পথ অনুসরণ করবে। মহাদেশের রাষ্ট্রনেতারা বিলক্ষণ জানেন, ইউরোপের কৌশলগত স্বশাসন অসাধ্য নয়, তবে এর জন্য অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ চাই।
তবে, সর্বাগ্রে, ইউরোপকে আমেরিকার উপরে তার মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নির্ভরতা কমাতে হবে। তার পরে নিজের নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের পথ খুঁজতে হবে। অন্যথায় ‘কৌশলগত স্বশাসন’ একটি অলীক স্বপ্ন হিসাবেই থেকে যাবে। আর ন্যাটো পরিণত হবে একটি পথ-আটকানো কাঠামোয়, এমন এক কাঠামো যা অতিক্রম করা ক্রমশই কঠিন হয়ে উঠবে ইউরোপের পক্ষে।
অন্যদিকে, বিশ্বের নেতাদের কাছে বিবেকবান ধনীদের দাবি, গণতন্ত্রকে ফিরে পেতে, ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হলে, আর সময় নষ্ট না-করে অতিধনীদের উপর কর বসানো দরকার। চিঠিতে বলা হয়েছে, অতিধনীদের উপর কর বসালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য-সহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করার জন্য টাকা জোগানো সম্ভব। এ বিষয়েও একটা পরিষ্কার হিসাব দেখিয়েছে অসরকারি সংস্থাটির প্রতিবেদন— কেবল এক বছরে যে বাড়তি টাকা গিয়েছে অতিধনীদের কাছে (আড়াই ট্রিলিয়ন ডলার) তা দিয়ে সারা বিশ্ব থেকে অতিদারিদ্র মুছে ফেলা সম্ভব— এক বার নয়, ছাব্বিশ বার।
অসাম্যের এই প্রবলতার সামনে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা যায়, অতিধনীদের একাংশ যে আরও বেশি কর দিতে চাইছেন, তা কেবল দরিদ্রের প্রতি দয়া-দাক্ষিণ্য প্রদর্শনের ইচ্ছাতে নয়। ক্রমবর্ধমান অসাম্যের ফলে বিশ্বের অর্থনীতি এক বেসামাল অবস্থায় চলে গিয়েছে, যার ফলে আখেরে প্রত্যেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অপূরণীয় ক্ষতি হবে পরিবেশ-প্রতিবেশিতার, সেই বোধ কাজ করছে তাঁদের মধ্যে। কিন্তু এই অনুরোধ মেনে ধনীদের উপর কর বাড়ানোর সাহস কোনও দেশের হবে কি?
সম্প্রতি সুইৎজারল্যান্ডে অতিধনীদের উপর উত্তরাধিকার কর বসানোর বিষয়ে জনমতদানের ব্যবস্থা হয়েছিল। কিছু অতিধনী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, এই আইন পাশ হলে তাঁরা অন্যত্র চলে যাবেন। জনমত যায় প্রস্তাবের বিপক্ষে, ফলে ধনীরা রেহাই পেয়েছেন। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতেও ‘বিলিয়নেয়ার ট্যাক্স’ আনার প্রস্তাব এসেছে, যাতে অতিধনীদের এক বার এককালীন ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। সেই টাকা দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কার হবে, ঘোষণা করেছে ক্যালিফোর্নিয়ার সরকার।
সে রাজ্যের প্রায় আড়াইশো বিলিয়নেয়ারের মধ্যে অনেকেই অবশ্য অন্যত্র যাওয়ার রাস্তা খুঁজছেন। অনেকে মনে করাচ্ছেন, করের হার যা-ই হোক, রাজকোষের অর্থ অধিকাংশই আসে ধনীদের থেকে। তাঁরা সরে গেলে সরকারেরই ক্ষতি। বিবেক বনাম ব্যক্তিস্বার্থের লড়াই সহজে থামার নয়। তবে, ধনকুবেররা দাবি করছেন, তাঁদের উপর আরও বেশি করে কর চাপানো হোক, এ কথা শুনে চট করে বিশ্বাস হতে চায় না। এমন আশ্চর্য ঘটনা দিয়েই এ বছর দাভোস-এর ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম শুরু হয়েছিল।
চব্বিশটি দেশের প্রায় চারশো ‘মিলিয়নেয়ার’ (দশ লক্ষ বা তার বেশি আমেরিকান ডলারের মালিক) একটি খোলা চিঠিতে বলেছেন, অতিধনীদের সঙ্গে বাকিদের সম্পদের ফারাক বেড়েই চলেছে, তাতে বিশ্ব চলে এসেছে সঙ্কটের একেবারে কিনারায়। সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের হাতে এখন যত সম্পদ রয়েছে, তা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ মানুষের চেয়ে বেশি। এই ব্যবধান প্রতি দিন বেড়েই চলেছে, দেশের মধ্যে, এবং প্রজন্মের মধ্যে।
সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক অসরকারি সংস্থা তার প্রতিবেদনে (‘রেজ়িস্টিং দ্য রুল অব দ্য রিচ: প্রোটেকটিং ফ্রিডম ফ্রম বিলিয়নেয়ার পাওয়ার’) দেখিয়েছে যে, কেবল ২০২৫ সালেই বিলিয়নেয়ার (একশো কোটি ডলারের মালিক) ব্যক্তিদের সম্পদ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার নজিরহীন। একই সময়কালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্রে বাস করছেন। উপরন্তু, অতিধনীরা বিশ্বের সর্বত্র নিজেদের লাভ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অর্থনীতির নিয়ম বদলাচ্ছেন। তাতে সাধারণ মানুষের অধিকার এবং স্বাধীনতার হানি হচ্ছে।
প্রায় একই সুরে ‘জেতার সময়’ (টাইম টু উইন) শিরোনামের চিঠিটিতে চারশো জন মিলিয়নেয়ার রাজনীতি এবং অর্থনীতির নেতাদের লিখছেন। চিঠির বক্তব্য, মাত্র কয়েক জন অতিধনী মানুষ তাঁদের অতিরিক্ত সম্পদ দিয়ে গণতন্ত্র কিনে নিচ্ছেন, প্রশাসনকে কুক্ষিগত করছেন, সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করছেন, প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবনের সম্ভাবনা সঙ্কীর্ণ করছেন, দারিদ্রকে গভীরতর করছেন, গ্রহকে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। ফলে ধনী এবং গরিব, সব মানুষের কাছেই যা মূল্যবান, সে সব ক্ষয়ে যাচ্ছে। দুঃখের বিষয় এই যে , তাতে কারুর কিছু আসে যায় না!
Advertisement



