• facebook
  • twitter
Thursday, 29 January, 2026

সমালোচনায় ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ নোবেল নিতে যাননি

কবিকে নোবেল দেওয়া হয় রাজভবনে

কুমারেশ চক্রবর্তী

অনেক তর্ক-বিতর্কের পরে সুইডিশ একাডেমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল, ভারতের কবি রবীন্দ্রনাথ টেগরকে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হবে। দিনটা ছিল ১২ নভেম্বর ১৯১৩। পরের দিন ১৩ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার পুরস্কারের কথা ঘোষণা করা হলো। সেই দিনই রয়টার মারফত সারা পৃথিবী জানল, ভারতের এক অপরিচিত কবি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন। ১৪ নভেম্বর কলকাতার সংবাদপত্রে খবরটি প্রকাশিত হলো। কলকাতা থেকে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত টেলিগ্রাম করে রবীন্দ্রনাথকে খবরটা জানালেন। কবি তখন শান্তিনিকেতনে কাজে ব্যস্ত। ১৫ নভেম্বর। জামাতা নগেন্দ্রনাথ তখন খেতে বসেছেন। সেই সময় টেলিগ্রামটি তার কাছে গেল। তিনি দ্রুত সেটা নিয়ে এসে কবির হাতে তুলে দিলেন। কবি তখন তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে শান্তিনিকেতনে কাজ পরিদর্শন করছেন। টেলিগ্রামটা তিনি হাতে নিয়ে পড়লেন। একবার দুবার তিনবার। তারপর টেলিগ্রামটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নেপালচন্দ্র রায় কে দিয়ে বললেন, ‘নিন নর্দমার তৈরি টাকা’, অর্থাৎ কবির কাছে নোবেলের গুরুত্ব হলো আশ্রমের কাজে ও উন্নয়নে সুবিধা হওয়া। টাকার অভাবে নর্দমার কাজ আটকে গিয়েছিল সেটা শেষ করা যাবে। এটাই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, ব্যক্তিগত সম্মানটা তারপরে।

Advertisement

ভাবতে অবাক লাগে ভারত তথা এশিয়াতে প্রথম নোবেল পুরস্কার সম্মানে ভূষিত হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অথচ দেশে এক শ্রেণীর রবীন্দ্র বিরোধী ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবী, তীব্রভাবে রবীন্দ্রনাথকে আক্রমণ করলেন এই পুরস্কারকে কেন্দ্র করে। নানা মিথ্যা অভিযোগ ও গল্প বানিয়ে তারা রবীন্দ্রনাথকে এবং তার নোবেল পুরস্কার কে ছোট করতে চাইলেন। সব খবরই রবীন্দ্রনাথ রাখেন। তিনি খুব ব্যথিত হলেন এই পুরস্কারের থেকে দেশের মানুষের তিরস্কার তাঁকে গভীরভাবে বিদ্ধ করল। তাই যখন কলকাতা থেকে প্রায় ৭০০ মানুষের একটি দল শান্তিনিকেতনে হাজির হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্বর্ধনা দেবার জন্য, রবি ঠাকুর কিন্তু মোটেই তাতে সন্তুষ্ট হলেন না। বরং খুব বিরক্ত হলেন এবং তিনি সেই সমাবেশেই তাঁর ভাষণে বিষয়টাকে আদৌ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা না করে মনের কথা সুস্পষ্টভাবে সেই সমাবেশে জানিয়ে দিলেন। সেই ভিড়ে সমবেত মানুষের উদ্দেশ্যে তিনি বললেন, বৈদেশিক বন্যায় নৌকা ভাসিয়ে যাঁরা তাঁকে সম্মান জানাতে এসেছেন তা তিনি বাস্তব বলে মনে করেন না। কারণ এই বন্যা কেটে গেলেই পড়ে থাকবে ভাঙাচোরা আবর্জনার অবশিষ্ট। বরং দেশের মানুষের কাছ থেকে যে নিন্দা তিনি পেয়েছেন তাই সত্য বলে তিনি গ্রহণ করছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বক্তব্যে কলকাতা থেকে আগত উৎসাহী মানুষরা খুব ভেঙে পড়ল। তারা ব্যথিত হলেন এবং উপলব্ধি করলেন একশ্রেণীর মানুষের সীমাহীন অভদ্রতা ও অপপ্রচারের জন্যই কবি ভীষণভাবে ব্যথিত এবং বিরক্ত। তবে ঘটনাচক্রে সেই দিনটা ছিল ৭ অঘ্রাণ। কবির জীবনে এক অতি মর্মান্তিক তারিখ। এই দিনে তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন, আবার এই দিনেই তাঁর অতি আদরের কনিষ্ঠ পুত্র বিদায় নিয়েছিলেন। তবে এই ব্যক্তিগত ব্যথা বেদনার থেকেও তিনি ব্যথিত হয়েছিলেন দেশের মানুষের মিথ্যা অপবাদে৷ তাই তিনি সেদিনকে তাঁর বেদানা হত হৃদয়ের সামান্য প্রকাশ করেছিলেন আগত অনুরাগীদের কাছে।

Advertisement

১০ ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের দিন ঘোষিত হল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই অনুষ্ঠানে গেলেন না, তিনি চিঠি লিখে জানিয়ে দিলেন তার এই অক্ষমতার কথা। সেইদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হয়ে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করলেন সুইডেনে অবস্থিত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মিস্টার ক্লাইভ। এরপরে যদিও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্টকহোম গিয়েছিলেন নোবেল কমিটির আমন্ত্রণে। সেটা ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ। কারণ নোবেল কমিটির নিয়ম অনুসারে নোবেল প্রাপককে একটি ভাষণ দিতে হয়। সেই নির্ধারিত ভাষণ দিতে কবি গেলেন পুরস্কার পাওয়ার ৭ বছর পরে। এবং সেখানে তিনি যে ভাষণটি দিলেন তা একেবারেই প্রথা বিরুদ্ধে। এবং অনন্য সম্পদ হিসেবে গণ্য হলো। ফলে স্থানীয় প্রধান চার্চ বিশপের আমন্ত্রণে গির্জায় তাঁকে যেতে হল এবং ভাষণ দিতে হলো। এই গির্জায় বাইরের লোকের ভাষণ নিষিদ্ধ তথাপি রবীন্দ্রনাথ সেই প্রথা ভেঙে আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে আবার একটি অসাধারণ ভাষণ প্রদান করলেন। তার ফলে সেখানে বহু আমন্ত্রণ আসতে লাগলো কবি রবীন্দ্রনাথকে একবার দেখার এবং তাঁর কথা শোনার জন্য।

নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের প্রায় দু’মাস পরে কলকাতার রাজভবনে শুধু রবীন্দ্রনাথের জন্যই নোবেল কমিটির অনুরোধে একটি অনুষ্ঠান করা হলো। ১৯১৪ সালের ২৯ জানুয়ারি রাজভবনে গভর্নর লর্ড কারমাইকেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে নোবেল পদক এবং পুরস্কার মূল্যের একটি চেক তুলে দিলেন। ভারতীয় টাকায় নোবেল পুরস্কারের তৎকালীন অর্থ ছিল এক লক্ষ ১৬ হাজার ২৬৯ টাকা।

বিদেশি পত্রিকায় প্রশংসা
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার লাভে ইউরোপ আমেরিকায় তোলপাড় পড়ে গেল। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বহু আলোচনা-সমালোচনা পর্যালোচনা হতে লাগলো। অন্য কোনও নোবেল প্রাপক নিয়ে এমন আলোড়ন ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। ডেইলি নিউজ এন্ড লিডার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় বড় করে লেখা হল— রক্ষণশীল হলেও সুইডিস একাডেমি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল দিয়ে বিশ্বজনিতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই প্রতিবেদনেই রবীন্দ্রনাথের অসীম মানসিক শক্তি দৃঢ়তা ও শুচি শুভ্র যুক্তিবাদী মানবিক লেখার প্রশংসা করা হয়। বলা হল, মহৎ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। মানবিকতা পূর্ব ও পশ্চিমে সর্বদাই সর্বত্র সমান। ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ানে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের নোবেল লাভে বিস্ময় প্রকাশ করে লেখা হলো, একটি ক্ষুদ্র বইকে নোবেলের মতো বিশ্ব সম্মান দেওয়া সাম্প্রতিক কালের এক অসাধারণ ঘটনা। রবীন্দ্রনাথ ভারতের শ্রেষ্ঠ কবি হতে পারেন। কিন্তু ইউরোপ আমেরিকায় তিনি অপরিচিত অখ্যাত। প্রতিবেদনের শেষে অবশ্য লেখা হলো, কবি তার বহুমুখী প্রতিভার দ্বারা সমগ্র ভারতীয়দের প্রভাবিত করেছেন, তিনি শুধু কবি নন, তিনি একজন ধর্ম নেতা, শিক্ষক, দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক। এই মুহূর্তে তাঁর সঙ্গে তুলনীয় কোনও কবি সমগ্র ইংল্যান্ডে নেই।

১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর ডেইলি এক্সপ্রেস লিখল অতীন্দ্রিয়বাদী বাঙালি কবি ১৯ বছর বয়সেই কাব্যগ্রন্থ নাটক উপন্যাস লিখে ফেলেছেন। বাহান্ন বছর বয়সেই তাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্মান লাভ করলেন। পলমট গেজেট ‘দিনের খবর’ শিরোনামে লিখল, রবীন্দ্রনাথকে পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি অভূতপূর্ব কর্তব্য পালন করেছেন। বইয়ের বাজারে কবির বই বেশি না থাকলেও গীতাঞ্জলির উৎকর্ষতা ও অনন্যতা অতুলনীয়। রবীন্দ্রনাথ শুধু ভারত নয় এশিয়ার জীবনকেও প্রভাবিত করেছেন। ডেইলি ক্রনিকেল এর শিরোনাম ছিল, বাংলার ভাববাদী কবির নোবেল পুরস্কার লাভ। এখানে লেখা হয়েছিল, তার গান শুধু গান নয়, এ তাদের সৌন্দর্যবোধ দেশপ্রেম ও জীবনানন্দের প্রতীক। ডেইলি মেল পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, স্বদেশের যেখানে বাংলা ভাষার প্রচলন আছে সেখানে ঘরে ঘরে, নদীর বুকে, পথে ঘাটে তার গান শোনা যায়। কবির সহজ সরল গান আসলে ভারতের কণ্ঠস্বর।

কবি ইয়েটস এক সংবর্ধনা সভায় বলেছিলেন, আমার সময় এমন ব্যক্তিকে জানিনা যিনি ইংরেজি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের কবিতার সমগোত্রীয় কিছু লিখতে সমর্থ হয়েছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলা ভালো যে, বিখ্যাত ইংরেজ কবি ইয়েটস রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির ইংরাজি অনুবাদের প্রুফ সংশোধন করেছিলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু বিতর্ক ও অপপ্রচার শুরু হয়েছিল। বলা হয়েছিল যে, ইয়েটস নাকি রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলিকে ভালো করে লিখে দিয়েছিলেন। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশীয় কিছু রবীন্দ্রবিদ্বেষী রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলেন অপপ্রচার করতে। এইসব অপপ্রচার তর্ক-বিতর্কের উপর জল ঢেলে দিয়েছিল বিশ্ব বিখ্যাত টাইমস পত্রিকা। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির পরে তারা একটি খুব বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেই প্রতিবেদনের শেষে তারা লিখলেন, গীতাঞ্জলির কবিতাগুলি রবীন্দ্রনাথের নিজের অনুবাদ। ফলে বহি বিশ্বে বিতর্কের অবসান হলেও দেশীয় পণ্ডিতরা হাল ছাড়েনি। যাইহোক এ বিষয়ে আরেকটি বিদেশি জনপ্রিয় পত্রিকা দি আইরিস টিাইসম ১৪ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথের ওপর একটি ছোট নিবন্ধ প্রকাশ করেন। তা শিরোনাম ছিল, ‘ভারতীয় কবি’। তাতে লেখা হল, ‘রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয় অকল্পনীয় হলেও অযৌক্তিক নয়। এই সম্মান একদিকে যেমন মহান সৃষ্টি কে সম্মান জানানো হয়েছে তেমনি আমরা ইউরোপীয়রা প্রাচ্যের কিছুটা কাছাকাছি আসতে পেরেছি। রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে এক নতুন যুগের সৃষ্টি হল।’

আত্মঘাতী বাঙালি
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পরে দেশে এক শ্রেণীর কিছু বাঙালি এবং কিছু অবাঙালি জোটবদ্ধ ভাবে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে চোড়াগোপ্তা আক্রমণ শানাতে কসুর করেনি। শুধুই ইংরেজ কবির কথা নয়, তারা এটাও বললেন যে, গীতাঞ্জলির কবিতাগুলি বা গান আসলে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যের থেকে নেয়া আর কিছু মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান গাথার ভাবান্তর। এইসব তর্ক-বিতর্ক এবং অপপ্রচার যে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থেকে সৃষ্টি তার প্রমাণ দেড়শ বছর অতিক্রান্ত রবীন্দ্রনাথ আজও প্রাসঙ্গিক এবং বাংলা তথা সারা বিশ্বে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। এইসব আক্রমণে রবীন্দ্রনাথ ব্যথিত হলেও বিচলিত হননি, কারণ তিনি সেই মানুষ, যিনি একে একে স্ত্রী পুত্র কন্যা সহ প্রিয়তম সাতজনকে অকালে হারিয়েছেন। তার পরেও সমস্ত বেদনাকে আত্মস্থ করে সব দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে গেছেন। তাই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ৭ দিন পরে তিনি লিখলেন, ‘আমার সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফুটবে ফুল ফুটবে।’

Advertisement