• facebook
  • twitter
Wednesday, 28 January, 2026

সিঙ্গুর থেকে ঘাটাল: রাজনীতি, উন্নয়ন আর এসআইআর বিতর্কে সরব মমতা

‘এসআইআর মানে সর্বনাশ। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলবে না। নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। বিজেপি হটাও, আমাদের অধিকার বাঁচাও।’

দু’দশক পর ফের রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ল সিঙ্গুরে। ভোটের মুখে সম্প্রতি মোদীর একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের শিলান্যাসের পর বুধবার মমতাও একাধিক সরকারি প্রকল্পের সূচনা করলেন। সিঙ্গুরের জনসভা থেকে কেন্দ্র সরকার, বিজেপি, এসআইআর প্রক্রিয়া এবং এনআরসি চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একইসঙ্গে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করলেন বহু প্রতীক্ষিত ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’-এর। প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সূচনা ঘিরে নতুন করে আশার আলো দেখছেন ঘাটাল ও আশপাশের এলাকার মানুষজন।

সিঙ্গুরের সভামঞ্চ থেকে মমতা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘এসআইআর মানে সর্বনাশ। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলবে না। নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করতে হবে। বিজেপি হটাও, আমাদের অধিকার বাঁচাও।’ তাঁর কণ্ঠে বারবার উঠে আসে এনআরসি আতঙ্কের প্রসঙ্গ। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ‘এসআইআর-এর নামে এনআরসি করার চক্রান্ত চলছে।’ তিনি কেন্দ্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘কাউকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠাতে দেব না। এটা বাংলা।’

Advertisement

সরাসরি কেন্দ্র ও বিজেপিকে নিশানা করে মমতার বক্তব্য, ‘আগে মানুষ হন, মানবিক হন।’ সিঙ্গুর আন্দোলনের স্মৃতি টেনে কেন্দ্রকে কড়া আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি সিঙ্গুরে ২৬ দিন অনশন করেছি। তোমরা কী করেছ, একটা ইট কি পুঁতেছ?’ সিপিএম আমলের অত্যাচারের প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, ‘অনেক অত্যাচার দেখেছি। এবার বিজেপি এসেছে।’

Advertisement

এসআইআর ইস্যুতে প্রশাসনকেও বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতা বলেন, ‘বয়স্ক, প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়ান। মানুষকে ভয় দেখাবেন না।’ একই সঙ্গে মানুষকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘প্রাইভেট কোম্পানির লোক বসে আছে, ভুলেও হাত দেবেন না। ফাঁসিয়ে দেবে।’ ভোটের আগে অন্য রাজ্যে আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূরণ না করার উদাহরণ তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

এদিন সভা থেকে একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও করা হয়। জানানো হয়, ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে আজ ২০ লক্ষ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে ৩২ লক্ষ মানুষের বাড়ি তৈরির অর্থ পৌঁছেছে উপভোক্তাদের কাছে।
আশা ও আইসিডিএস কর্মীদের মোবাইল ফোন কেনার জন্য ১০ হাজার টাকা করে সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কৃষকদের ১০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শস্যবিমায় এ পর্যন্ত কৃষকদের জন্য ৪ হাজার কোটির বেশি ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। ২৯০টি উদ্বাস্তু কলোনিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। খাদ্যসাথী, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের আওতায় সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ৮ একর জমির উপর সিঙ্গুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। তবে কৃষিজমিতে শিল্প হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী।

সিঙ্গুর থেকেই ভার্চুয়ালি উদ্বোধন হয় ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে ঘাটালবাসীর অন্যতম বড় দাবি ছিল। মমতা বলেন, ‘কেন্দ্র টাকা দেয় না। তাই আমরা রাজ্যের টাকায় করেছি। ভিক্ষা করব না।’ জানানো হয়, প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য। দেব এই প্রকল্প প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই ফাইলটা বহু সরকারের টেবিলে ছিল। কেউ কাজ করেনি। কথা রেখেছেন একমাত্র মুখ্যমন্ত্রী।’

এদিনের সভায় আবেগপ্রবণ হয়ে বক্তব্য রাখেন সাংসদ দেব ও রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেব বলেন, ‘যে সরকার কথা দিয়েছে, ভোটের পর কথা রেখেছে, সেই সরকারই ভোট পাবে। আমি ভাবলাম দু’লাইন বলে চলে যাব। কিন্তু আজকে দিদি যে কাজটা করলেন এটা কোনও সোজা ব্যাপার নয়। ঘাটালের বাসিন্দারা ভেবেছিলেন এমন কেউ আসবেন যে আমাদের দুঃখ বুঝবেন। আমি প্রথমবার সাংসদ হিসাবে শপথ নেওয়ার সময় বাংলায় বলেছিলাম। ঘাটাল নিয়ে বলেছিলাম। আমি দিল্লিতে গিয়েছি। বৈঠক করেছি। কিন্তু আমাদের কথা রাখেনি কেউ। দিদি কথা দিয়েছিলেন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান করবেন। বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিলেন। করলেন আজ। কেউ কথা রাখেনি। যিনি কথা রেখেছেন তিনি মুখ্যমন্ত্রী। এখন সোশাল মিডিয়ার যুগ। একটা কথা বললেই ট্রোল হবেন। যে সরকার কথা দিয়েছে, ভোটের পর কথা রাখছে সেই তো ভোট পাবে। আমি ঘাটালের ছেলে। এই ফাইলটা প্রতিটি সরকার, প্রতিটা দপ্তরের টেবিলে ছিল। কিন্তু কেউ কাজ করেনি। ভোট নিয়ে চলে যায়নি। যে দলটা গত ১৫ বছর ধরে মানুষকে আগলে রেখেছে তার তো জেতা উচিত। যে মানুষটা শুধু উন্নয়নের কাজ করে গিয়েছে। তিনি দেখেননি কে সিপিএম, কংগ্রেস করে। শুধু সকলের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। আমি জোর করব না ভোট দেওয়ার জন্য। একজন মহিলা গত ১৫ বছর ধরে সকলের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। আজ আমার বলার দিন নয়। আমার গর্বের দিন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের শুভ উদ্বোধন হল আজ। দিদি এবং অভিষেককে হাতজোড় করে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’

রচনা বলেন, ‘আগামী ৩ মাস আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় সহাবস্থান— সবকিছুর জন্য একসঙ্গে লড়াই করব। এখন থেকে লড়াই শুরু। এভাবে সমর্থন পেলে বাংলায় তৃণমূলের জয়জয়কার হবে। যারা বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই। আমরা দুর্গাপুজো, ইদ, ছট, ক্রিসমাস পালন করি। এইটুকু জায়গাও ছাড়ব না। সকলে মিলে লড়াই করব। যতদিন না ভোট শেষ হচ্ছে ততদিন আপনাদের পাশে আছি। সাথে আছি।’

সভা শেষে কবিতা পাঠের মাধ্যমে এসআইআর ও আতঙ্কের বিরুদ্ধে বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কণ্ঠে স্পষ্ট বার্তা, এই লড়াই শুধু রাজনৈতিক নয়, নাগরিক অধিকারের লড়াই। সিঙ্গুর থেকে সেই বার্তাই ছড়িয়ে পড়ল গোটা বাংলায়।

Advertisement