• facebook
  • twitter
Saturday, 24 January, 2026

ইডির অধিকার নিয়ে প্রশ্ন

সংবিধানের ৩২ ও ২২৬ অনুচ্ছেদ মূলত নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য। বহু দশকের বিচারব্যবস্থাগত ব্যাখ্যায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে— এই অনুচ্ছেদগুলি কোনও সরকারি সংস্থা বা রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘অধিকার’ কার্যকর করার অস্ত্র নয়।

প্রতীকী চিত্র

একই সুরে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল, বাম ও ডিএমকে— এই ঘটনা নিছক রাজনৈতিক কাকতালীয় নয়, বরং ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সাংবিধানিক নৈতিকতার এক গুরুতর সন্ধিক্ষণ। প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে প্রযুক্তিগত– এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) কি সংবিধানের ৩২ বা ২২৬ অনুচ্ছেদের আওতায় নিজের অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারে? কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির সীমা, ক্ষমতা ও রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বৃহত্তর বিতর্ক।

সংবিধানের ৩২ ও ২২৬ অনুচ্ছেদ মূলত নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য। বহু দশকের বিচারব্যবস্থাগত ব্যাখ্যায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে— এই অনুচ্ছেদগুলি কোনও সরকারি সংস্থা বা রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘অধিকার’ কার্যকর করার অস্ত্র নয়। রাষ্ট্র নিজেই যদি অধিকার-রক্ষাকারী হয়, তবে সে আবার অধিকার-ভোগকারী কীভাবে হয়— এই মৌলিক দ্বন্দ্বই আজ ইডির মামলার কেন্দ্রে।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গে আইপ্যাকের ঠিকানায় তল্লাশি ঘিরে পুলিশের বাধা ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ইডি যখন সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে যায়, তখনই প্রথম প্রশ্ন ওঠে– একটি তদন্তকারী সংস্থা কি নিজেকে ‘অধিকার লঙ্ঘনের শিকার’ বলে দাবি করতে পারে? এখন সেই প্রশ্নই আরও জোরালো হয়েছে কেরল ও তামিলনাড়ুর হস্তক্ষেপে। দুই রাজ্যের বক্তব্য অভিন্ন– সংবিধান ইডিকে কোনও মৌলিক অধিকার দেয়নি, অতএব রিট পিটিশনের অধিকারও দেয় না।

Advertisement

কেরলের সোনা পাচার মামলাটি এই বিতর্ককে আরও স্পষ্ট করে তোলে। রাজ্য সরকার অভিযোগ করেছে, ইডি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন-সহ শাসক দলের নেতাদের ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষিতে বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। কেরল হাই কোর্ট তাতে স্থগিতাদেশ দিলেও, মূল সাংবিধানিক প্রশ্নটি থেকেই যায়— ইডি কি এমন কোনও অবস্থানে রয়েছে, যেখানে সে রাজ্যের বিরুদ্ধে ‘অধিকার লঙ্ঘন’-এর অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে তার পরিণতি সুদূরপ্রসারী। তা হলে প্রতিটি তদন্তকারী সংস্থা, প্রতিটি আমলাতান্ত্রিক দপ্তর নিজেকে এক একটি স্বতন্ত্র অধিকারভোগী সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পুলিশের ভূমিকা বা সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগ— সব কিছুর বিরুদ্ধেই কেন্দ্রীয় সংস্থা সরাসরি আদালতে ছুটতে পারবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।
অন্য দিকে, যদি আদালত স্পষ্ট করে জানায় যে, ইডির মতো সংস্থা রিট পিটিশন দায়েরের অধিকারী নয়, তবে তা কেবল একটি আইনি ব্যাখ্যা নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে এক সাংবিধানিক প্রতিরোধ। এতে স্পষ্ট হবে, তদন্তকারী সংস্থাগুলি আইনপ্রয়োগের যন্ত্র, তারা নিজেরা আইনের ঊর্ধ্বে বা আইনের সমান কোনও অধিকারসত্তা নয়।

এই বিতর্কের আর একটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইডি ও সিবিআই-এর ভূমিকা নিয়ে যে রাজনৈতিক অভিযোগ উঠেছে— বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলিকে নিশানা করা, নির্বাচনের আগে তৎপরতা বাড়ানো, ক্ষমতাসীন দলের ক্ষেত্রে নীরবতা— তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এই প্রেক্ষাপটে ইডির আদালত-মুখী কৌশল অনেকের কাছেই ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

এই বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চ যে প্রশ্নটি খতিয়ে দেখতে চলেছে, তা কেবল একটি সংস্থার আইনি অধিকার নির্ধারণ করবে না। তা নির্ধারণ করবে— ভারতের সংবিধান কি এখনও নাগরিক ও রাজ্যের স্বাধীনতার ঢাল হয়ে থাকবে, না কি তা কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হাতে আর একটি অস্ত্রে পরিণত হবে। শুনানি এবং রায়দান আপাতত স্থগিত রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে।

মনে রাখতে হবে, এই মামলার রায় নিছক আইনি নয়, তা রাজনৈতিক নৈতিকতা ও সাংবিধানিক ভারসাম্যের পরীক্ষাও বটে।

Advertisement