• facebook
  • twitter
Tuesday, 20 January, 2026

নারী সত্যাগ্রহী সমিতি ও বীরাঙ্গনা আভা দে

১৯৩২ সালে ২৬ জানুয়ারি মনুমেন্টের তলায় গিয়েছিলেন আভা দে স্বাধীনতা উপলক্ষ্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে। সভা ভাঙবার জন্য পুলিশ তাদের ঘোড়া চালিয়ে দিলে আভা রণরঙ্গিনী মূর্তিতে ঘোড়ার লাগাম ধরে তার প্রতিরোধ করেছিলেন

ফাইল চিত্র

বিমলকুমার শীট

১৯৩০ সালে গান্ধীজীর ডাকে এল আইন অমান্য আন্দোলনের জোয়ার। পূর্ববতী আন্দোলন অপেক্ষা এই আন্দোলনে বাংলার নারীশক্তি তীব্র গতি এনে দিয়েছিল । সেই সময় যে সমস্ত বীরাঙ্গনা ইংরেজদের আইন অবজ্ঞা করে নিজের জীবন তুচ্ছ করে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে গেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম আভা দে। তবে তাঁর জন্মকাল ও জন্মস্থান সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। ১৯৩০ সালে লবণ আইন অমান্য আন্দোলনের সময় শান্তি দাস এবং আরও কয়েকজন কংগ্রেস নেত্রী ও কর্মী কলকাতায় ‘নারী সত্যাগ্রহী সমিতি’ গঠন করেন। এই সমিতি কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। কিন্তু কর্মীগণ কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলন অতি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। সরলাবালা সরকার তাঁর আত্মজীবনী ‘হারানো অতীত’-এ লিখেছেন— ‘নারী সত্যাগ্রহীদের কার্যালয় ছিল রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটে, সম্ভবত বাড়িটির নম্বর ১৪৪ হইবে। এই বাড়িতে শান্তি দাশ ও তাঁহার জ্যৈষ্ঠা প্রীতি দাশ জননী অশোকলতা দাশের সহিত বাস করিতেন। ওই বাড়িতেই পরামর্শ সভা ও অধিবেশনাদি আহূত হইত। উর্মিলাদেবী এই সমিতির সভানেত্রী ছিলেন। কার্যানির্বাহক সভায় জ্যোর্তিময়ী গাঙ্গুলি, মোহিনী দেবী ও আরও অনেকে ছিলেন বলিয়া স্মরণ হয়। শান্তি দাশ ও বিমলপ্রতিভা দেবী যুক্ত কার্য পরিচালিকা এবং জ্যোৎস্না মিত্র তাঁহার সহকারিনি ছিলেন’।

Advertisement

গ্রাম থেকে সভা সমিতিতে নারী সত্যাগ্রহী সমিতি হতে প্রচারিকা পাঠাবার জন্য আবেদন এলে সেখানে সমিতির একজন বা দু’জনকে পাঠানো হত। সেই সমস্ত কর্মীদের গ্রামাঞ্চলে ৩/৪ বা তার বেশি দিন কাটিয়ে আসতে হতো, কেননা প্রায়ই কাছাকাছি এক গ্রাম থেকে অপর গ্রামে ইংরেজ বিরোধী প্রচারে আসতে হত। মাঝে মাঝে সরলাবালা সরকারকে কুষ্টিয়া-কুমারখালি এবং হাওড়া-আমতা লাইনের অনেকগুলি গ্রামে যেতে হয়েছে। প্রত্যেক সভায় এত নারী-সমাবেশ হত যে, স্থান সংকুলান কঠিন হত। চাষীবাড়ির নারীরাও এই সমস্ত দিন সভায় যোগদান করত। পুলিশের দৃষ্টি এড়াবার জন্য এই সমস্ত নারীদের সমস্ত দিন নানা স্থানে গোপনে গোপনে ঘুরতে হতো।

Advertisement

নারী সত্যাগ্রহী সমিতির কাজ প্রথমটা তেমন বিপজ্জনক ছিল না, কিন্তু ক্রমে শাসক পক্ষের বাধা কঠোর হতে লাগল এবং গ্রেপ্তার আরম্ভ হল। সর্বপ্রথম জেলে যান পদ্মরাজ জৈনের কন্যা ইন্দুমতী গোয়েঙ্কা। তবে অল্প সময়ের মধ্যে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়ে ছিল। ইন্দুমতীর মোকদ্দমা ব্যাংকশাল কোর্টের রকসবার্গ এজলাসে হয়েছিল। বিচারের সময় একশ জন নারী সত্যাগ্রহীকে বিচারকক্ষে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ম্যাজিস্ট্রেট এলে সবার উঠে দাঁড়াবার নিয়ম থাকলেও কেউ দাঁড়াননি। এই মামলায় ইন্দুমতীর নয় মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড হয়। দণ্ডাদেশ ঘোষণার সময় তুমুল ‘বন্দেমাতরম’ জয়ধ্বনিতে আদালত ঘর ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। শান্তি দাশ তখনই বড়ো বাজারে গিয়ে হরতাল ঘোষণা করে দিল। এ সময় আনন্দবাজার পত্রিকা খবরের কাগজে সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদ স্বরূপ ছয় মাস বের হয়নি। নারী সত্যাগ্রহী সমিতির সঙ্গে আভা দে যুক্ত ছিলেন। এই দলের কর্মীদের আইন ভঙ্গের অপরাধে গ্রেপ্তার ও অভিযুক্ত হতে হল।

প্রায় পঞ্চাশ জন মহিলা একসঙ্গে গ্রেপ্তার হন এবং জোড়াবাগান কোর্টে তাদের বিচার হয়। কিন্তু সরকারের দণ্ডাদেশের পরেও নারী সত্যাগ্রহী দলের প্রভাব কমল না, বরং আরও বেড়ে গেল। নানা স্থান থেকে দলে দলে নারী সত্যাগ্রহী এসে আন্দোলনে যোগ দিতে লাগল। তখন সরকার এই সমিতিকে বে-আইনি বলে ঘোষণা করে দিল। যেদিন এই ঘোষণা বের হল সেদিন উর্মিলা দেবীর খুব আনন্দ। তিনি বলেন, ‘আজ আমরা বিজয়ী ও ইংরাজ গভর্নমেন্ট পরাজিত’। যাই হোক এরপর আর দলে দলে মেয়ে পাঠানো হবে না, কেননা তা হলে সত্যাগ্রহ আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে, সুতরাং প্রত্যহ ৩/৪ জন করে মহিলা পাঠিয়ে আন্দোলন চালু রাখা হল। পরিণামে প্রেসিডেন্সি জেলখানা ইতিমধ্যে সত্যাগ্রহী দলে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আভা দেও নারী সত্যাগ্রহী সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বে-আইনি শোভাযাত্রা ও সভায় যোগদান করে দণ্ডিত হয়ে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী থাকেন।

নারী সত্যাগ্রহীদের প্রায় সকলেই সাধারণ কয়েদী নারীদের জন্য যতটা পারা যায় সুখ সুবিধার চেষ্টা করতেন। তাদের জন্য বাইরে থেকে যে খাবার আসত তা সকলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হত। নির্ঝরিণী দেবীর উপর প্রধানত এই বণ্টনের ভার ছিল। তিনি সকলের কাছে ‘পিসিমা’ নামে পরিচিত ছিলেন। উর্মিলা দেবী, মোহিনী দেবী প্রভৃতি সকলে কারারুদ্ধ হয়েছেন। জাতীয় দিবস উপলক্ষে জেলে পতাকা উত্তোলন নিয়ে দুই দলে মত বিরোধ হয়। এক দলের অধিনায়িকা ছিলেন উর্মিলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলি, মোহিনী দেবী প্রভৃতি বয়স্কা মহিলা। এরা এইভাবে পতাকা উত্তোলন সংগত বলে মনে করলেন না। অপর দলে ছিলেন শান্তি দাশ ও বিমলপ্রতিভা দেবী প্রভৃতি। এঁরা ‘পতাকা তুলতেই হবে’ বলে দৃঢ় নিশ্চিত। জেলখানার প্রাঙ্গনে একটি প্রকাণ্ড গাছ ছিল। কয়েকদিন অবিরত বৃষ্টির ফলে গাছের গুঁড়িটা অত্যন্ত পিছল হয় গিয়েছিল। স্থির করা হল, এই গাছটির উপরের ডালে পতাকা বেঁধে দিতে হবে, তাহলে বহুদূর হতেও পতাকা দেখতে পাওয়া যাবে। আভা দে গাছে চড়তে জানতেন, কিন্তু সেই বৃষ্টিতে পিছল গাছে চড়ে উপরের ডালে পতাকা বাঁধা অত্যন্ত কঠিন কাজ, যে কোন মূহূর্তে পা পিছলে পড়ে যাবার ভয় ছিল।

কিন্তু আভা দে হাসিমুখে সেই ভার নিলেন। সরলাবালা সরকার লিখেছেন- ‘ত্রিবর্ণ পতাকা গোপনে প্রস্তুত করা হইয়াছিল, কাপড়ের পাড় প্রভৃতি জুড়িয়া পতাকাটি তৈরি করা হইলেও তাহা বেশ বড়ো ও সুন্দর হইয়াছিল। অতি সন্তর্পনে আভা গাছে উঠিতে লাগিল এবং অপর সকলে তাঁহার দিকে চাহিয়া রহিল, পরে গাছের সর্বোচ্চ ডালে উঠিয়া আভা পতাকা উড়াইয়া দিল এবং তরুতলস্থ সত্যাগ্রহীবৃন্দ ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনি করিয়া উঠিলেন’। পতাকা বহুদূর হতে দেখা যেতে লাগল। জেলের জমাদারনি, মেট্রন সব ছুটে এল। বাইরে থেকে ছুটে এল জেলার, জমাদার ও সেপাই। জেলা সুপারিণ্টেণ্ডেন্ট মেজর সিং যখন গাছের নীচে এসে উপস্থিত হল তখনও আভা গাছ থেকে নামতে পারেননি। পাছে তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে পা পিছলে সে পড়ে যান এই ভয়ে মেজর সিং সকলকে সতর্ক করলেন, তিনি নিজেও অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলেন। আভা নির্বিঘ্নে ধীরে ধীরে গাছ হতে নামলেন৷

জেলকর্মীরা টেনে ছিঁড়ে ফেলল জাতীয় পতাকা৷ জেলখানা তোলপাড়। অবিরাম জয়ধ্বনি চলছে— ‘জাতীয় পতাকা কী জয়’, ‘মহাত্মা গান্ধীজী কী জয়’, কে কার তোয়াক্কা রাখে! মেজর সিং জিজ্ঞাসা করলেন— অপকার্যের নেতৃত্ব কে নিয়েছিল ? এবং কারা সেই দলে ছিল? এই প্রশ্নে সকল মেয়েই একযোগে উত্তর দিল– ‘আমি ছিলাম। উর্মিলা দেবী, মোহিনী দেবী আপনারা? কিন্তু তাদের নীরবতাকেই সম্মতি জ্ঞাপন বলে ধরে নেওয়া হল, এতে শান্তি ও বিমলপ্রতিভা দেবী বাধা দিয়ে বললেন, ‘না, এরা পক্ষে নন, বিপক্ষে ছিলেন। এ কী অন্যায় কথা! তখন যাঁরা মত দেননি এখন শাস্তির ভাগ নেবার তাদের কি অধিকার আছে’? আভা জেলের এই নিয়ম ভঙ্গ করার সাজা ও সম্পূর্ণ কারাদণ্ড ভোগ করার পর মুক্তি পান ১৯৩০ সালের শেষে।

আর এই সমিতির কার্যকলাপ দেড় বা দু-বৎসর পর্যন্ত চলেছিল। এদের অনেকে করাচি কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন। সমিতির শেষ সভা আহ্বান করা হয় কলকাতা অ্যালবার্ট হলে। মাত্র দু’জন মুসলমান বালিকা হাসানারা বেগম ও দৌলতেন্নেছা খাতুন নারী সত্যাগ্রহী দলে যোগ দিয়ে কারাবরণ করে ছিলেন। ১৯৩২ সালে ২৬ জানুয়ারি মনুমেন্টের তলায় গিয়েছিলেন আভা দে স্বাধীনতা উপলক্ষ্যে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে। সভা ভাঙবার জন্য পুলিশ তাদের ঘোড়া চালিয়ে দিলে আভা রণরঙ্গিনী মূর্তিতে ঘোড়ার লাগাম ধরে তার প্রতিরোধ করেছিলেন এবং ঘোড়ার পায়ের নীচে চাপা পড়ে যাওয়া মহিলাকে উদ্ধার করেছিলেন। ছয় মাস জেল খেটে বাইরে এসে আভা কল্যাণী দাসের সঙ্গে বিপ্লবী দলে যোগদান করেন। ছাত্রী সংঘের পক্ষ থেকে একবার সাইকেল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। অদ্ভুত সাহস ছিল তাঁর। অন্যায় সহ্য করার মেয়ে তিনি ছিলেন না। প্রাণ ঢেলে লোকের উপকার করতে ভালোবাসতেন। ১৯৩৮ সালে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হয়ে আভা দে মারা যান ।

Advertisement