• facebook
  • twitter
Wednesday, 21 January, 2026

কল্পতরু উৎসব: সেজে উঠেছে কাশীপুর উদ্যানবাটী

কাশীপুর রামকৃষ্ণ মঠ যেন আজ সমার্থক হয়ে উঠেছে কল্পতরুর। আক্ষরিক অর্থেই এই মঠ সারা বছর ধরে কল্পতরু অনেক মানুষের কাছে।

অতনু রায়

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘ভগবান কল্পতরু। কল্পতরুর কাছে বসে যে যা চাইবে, তাই পাবে। এজন্য সাধন ভজন করে যখন মন শুদ্ধ হয়, তখন সাবধানে কামনা ত্যাগ করতে হয়।’

Advertisement

আজ ১ জানুয়ারি। কল্পতরু উৎসব। ১৮৮৬ সালে আজকের দিনেই কাশীপুর উদ্যানবাটীতে কল্পতরু হয়েছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। গৃহী শিষ্যদের বলেছিলেন, ‘আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হউক’। সেই থেকে পয়লা জানুয়ারি কল্পতরু দিবস।

Advertisement

ডাক্তার বললেন, আপাতত কিছুদিন যদি ঠাকুর বাগানবাড়িতে থাকেন তাহলে গাছপালার মধ্যে নির্মল বাতাসে গলার রোগের অনেকটা উপশম হবে। সেই মতো ঠাকুর এসে পৌঁছলেন কাশীপুরের বাগানবাড়িতে।

কাশীপুরের রানী কাত্যায়নীর জামাইয়ের বাগানবাড়িই হচ্ছে আজকের কাশীপুর উদ্যানবাটী। ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল দত্ত চিকিৎসা করেন ঠাকুরের। লাইকোপোডিয়াম ২০০ হোমিওপ্যাথি ওষুধে কিছুটা লাভ হয়েছে। বাগানবাড়িতে আসার পর থেকে একবারও দোতলার ঘর থেকে নামতে পারেননি। পয়লা জানুয়ারি রামলাল চট্টোপাধ্যায়কে ঠাকুর বলেন, ‘আজ ভাল আছি বলে মনে হচ্ছে, চল একটু নিচে বেড়িয়ে আসি।’ সেদিন শুধু ঠাকুরের গৃহীভক্তরা ছিলেন।

বেলা তিনটে। ঠাকুর লালপাড়ের একটা ধুতি, ফতুয়া, লালপাড়ের চাদর, কানঢাকা টুপি আর চটি পড়ে বাগানে বেড়াতে নামলেন। ঠাকুর জানতেন যে গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর অন্ধ অনুরাগী। বলতেন, ‘পাঁচ সিকে পাঁচ আনা বিশ্বাস’। ঠাকুর গিরিশকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি আমার মধ্যে কী দেখেছো গিরিশ যে চারিদিকে লোককে এত বলে বেড়াও যে আমি অবতার?’ গিরিশ বলেন, ‘ব্যাস-বাল্মিকী যাঁর কথা বলে শেষ করতে পারেননি, আমি তাঁর সম্পর্কে এর বেশি আর কী বলতে পারি?’ রোমাঞ্চিত ঠাকুর সমাধিস্থ হলেন। তার আগে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘তোমাদের কী আর বলব, তোমাদের সকলের চৈতন্য হোক।’

১৮৮৫ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৮৮৬ সালের ১৬ আ​গস্ট, মানে মহাপ্রয়াণ পর্যন্ত উদ্যানবাটীতেই কাটান ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ।

এই বিশেষ সময়ে সেজে ওঠে উদ্যানবাটী প্রাঙ্গণ। ঠাকুরকে প্রণাম করে মনের ইচ্ছেপূরণ হওয়ার টানে আসেন কত কত মানুষ! এই বছরও ব্যতিক্রম নয়। তিনদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে এবারেও। ১ জানুয়ারি ‘কল্পতরু উৎসব’ উপলক্ষ্যে সকলের জন্য শুকনো প্রসাদ বোঁদে এবং খিচুড়ি ভোগ। প্রসাদ ও ভোগের জন্য কোনো কুপনের প্রয়োজন নেই। প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয় এই বিশেষ দিনে। বেলুড় মঠের অধ্যক্ষ স্বামী গৌতমানন্দ গতকাল, মানে ৩১ ডিসেম্বর প্রণাম সেরে গেছেন। এছাড়া আজ, উৎসবের দিন কাশীপুর মঠের সাতজন সহ প্রায় ৩৫-৪০ জন সন্ন্যাসী উপস্থিত থাকছেন। উপস্থিত থাকবেন কাশীপুর রামকৃষ্ণ মঠের অধ্যক্ষ স্বামী দিব্যানন্দ। প্রসঙ্গত, ১৯৪৬ সাল থেকেই উদ্যানবাটী রামকৃষ্ণ মঠ, বেলুড় মঠের শাখা হয়ে ওঠে।

এই দিন ভোর চারটেয় মঙ্গলারতি। ভোর পাঁচটায় ঊষাকীর্তন। পাঁচটার সময়েই জনগণের উদ্দে​শে খুলে দেওয়া হবে উদ্যানবাটী প্রাঙ্গণ। সকাল সাতটায় ঠাকুরের বিশেষ পুজো এবং হোম। সাড়ে আটটার সময় ঠাকুরের প্রিয় গান, দুপুর ২:২০তে শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ পাঠ ও ব্যাখ্যা করবেন স্বামী উমাপদানন্দ। বিকেল চারটেয় ঠাকুরের জীবন ও বাণী নিয়ে ধর্মসভায় সভাপতিত্ব করবেন রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের সাধারণ সম্পাদক স্বামী সুবীরানন্দ।

কাশীপুর রামকৃষ্ণ মঠ যেন আজ সমার্থক হয়ে উঠেছে কল্পতরুর। আক্ষরিক অর্থেই এই মঠ সারা বছর ধরে কল্পতরু অনেক মানুষের কাছে। কাশীপুর মঠের অধ্যক্ষ স্বামী দিব্যানন্দ বলেন, ‘ঠাকুর, মা ও স্বামীজির তিথি পুজোর পাশাপাশি গুরু পূর্ণিমা মঠের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। আর ২০২২ সাল থেকে প্রত্যেক মাসে একদিন করে মঠে নরনারায়ণ সেবার আয়োজন করা হয়। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে ১১০ জন করে মানুষ আসেন। তাদের থালি, শাড়ি, সাবান ও টুথপেস্ট দেওয়া হয়। তারা দুপুরের প্রসাদ পান। তাদের যাতায়াত খরচাও বহন করে মঠ কর্তৃপক্ষ। আগামী ৭ জানুয়ারি আয়োজন করা হয়েছে এই বছরের প্রথম নরনারায়ণ সেবার।’

মঠের তরফে সারাবছর ধরে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে ৫০০ শাড়ি আর ৫০০ কম্বল বিতরণ করা হয়। আলিপুর এবং দমদম সেন্ট্রাল জেলের বন্দীদেরও কম্বল ও শাড়ি দেওয়া হয়। বছরে একবার করে আয়োজন করা হয় রক্তদান শিবির ও চক্ষু পরীক্ষা কেন্দ্রেরও।

Advertisement