ভোট হয় নোটে। এমন একটা কথা চা-বাগান, কোলিয়ারি ও বস্তি এলাকায় বহুদিন ধরে চালু আছে। মূলত ভোটের কিছুদিন আগে ভোটারদের কাছে ক্যাশ বিলি শুরু হয়। তা আটকাতে সতর্ক থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। প্রতিপক্ষষ দল যাতে নোট দিয়ে ভোট ম্যানেজ না করতে পারে তার জন্য বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক কর্মীরা নজরদারি বাড়িয়ে দেয়। নির্বাচন কমিশনও ভোটে টাকার খেলা বন্ধ করতে চায়। তার জন্য প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে সর্বাধিক কত টাকা খরচ করতে পারবেন, তা ঠিক করে দেওয়া হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে নাকা চেকিং হয়। তল্লাশির সময় উদ্ধার হয় কয়েক কোটি টাকা। দেশজুড়ে এইসব চলতে থাকে।
সম্প্রতি বিহারের নির্বাচনে বিপুল সাফল্য পেয়েছে এনডিএ জোট। এই সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা নীতীশ কুমারের মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনের মুখে মহিলাদের ১০ হাজার করে টাকা দেওয়ায় ভোটের খেলা ঘুরে গিয়েছে। টাকা দেওয়ার কারণেই মহিলা ভোটদানের হার বেড়ে ৭১ শতাংশ হয়েছিল। সেই মহিলাদের একটা বড় অংশের সমর্থন গিয়েছে এনডিএ জোটের দিকে।
সরকারিভাবে অখরচ বশ্য জানানো হয়নি, বিহারের কত মহিলা ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। প্রশান্ত কিশোরের দল জন সুরজ পার্টির দাবি, সংখ্যাটি প্রায় দেড় কোটি। দাবি সত্য হলে, এই খাতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সেটাও নাকি দেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণের টাকায়। এক কথায়, নীতীশ কুমার ঋণ করেই ঘি খাওয়ার পরিকল্পনা আগেই নিয়েছিলেন।
Advertisement
২০২২ সালের জুলাই মাসে উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে দান খয়রাতির সংস্কৃতি দেশের পক্ষে বিপজ্জনক।’ কোনও দলের নাম না করলেও লক্ষ্য যে কংগ্রেস, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিজেপি নেতৃত্ব বারবার ঘোষণা করেছে তারা ভোটের জন্য ‘রেউড়ি’ রাজনীতি করে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি ও তার জোট সরকারের ক্ষমতা দখলের অস্ত্র হয়ে উঠেছে তথাকথিত দান খয়রাতির রাজনীতি।
Advertisement
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ওড়িশায় সুভদ্র প্রকল্পের সুযোগসুবিধা পান প্রায় এক কোটি মহিলা। খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকা। মহারাষ্ট্রে লড়কি বহিন যোজনায় প্রায় আড়াই কোটি মহিলা সুবিধা পান। সরকারের ব্যয় হয় দেড় হাজার কোটি টাকা। এছাড়া মধ্যপ্রদেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মহিলার জন্য ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং আসামে প্রায় ৪০ লক্ষ মহিলার জন্য সরকার খরচ করে ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।
একদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যাকে ‘রেউড়ি’ রাজনীতি বলে কটাক্ষ করেছিলেন, এখন তাকেই বিজেপি আঁকড়ে ধরছে। এর কারণ নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতিই পূরণ হয়নি। ভারতীয়দের কালো টাকা, যা সুইস ব্যাঙ্কে গচ্ছিত আছে, তা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। বছরে দু’কোটি বেকারের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অথচ বেকারত্ব শিখর ছুঁয়েছে তাঁরই আমলে। ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের জেরে চাকরির পথ সঙ্কুচিত হয়েছে। রেলে লক্ষ লক্ষ পদ ফাঁকা রয়েছে। নিয়োগ হচ্ছে না। সেনাবাহিনীতেও একই অবস্থা। জঙ্গি মোকাবিলার উদ্দেশ্যেই হয়েছিল নোটবন্দি। অথচ তাঁরই আমলে একের পর এক জঙ্গি হানার ঘটনা ঘটেছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মোবাইল নম্বর যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হয়েছে। তাতে সাধারণ মানুষের কিছু সুবিধা না হলেও সাইবার প্রতারকরা নিমেষের মধ্যে অ্যাকাউন্টে থাকা লক্ষ লক্ষ টাকা হাওয়া করে দিচ্ছে।
বিজেপি প্রচার করে যে, ডাবল ইঞ্জিন সরকার থাকলে সব সমস্যা থেকে মুক্তি। বেকারের চাকরি হবে। কোনও অভাব থাকবে না। দুর্নীতি থাকবে না। তা সত্ত্বেও ভোটে জেতার জন্য ‘বেউড়ি’ রাজনীতিতেই ভরসা রাখতে হচ্ছে বিজেপিকে। যে রেউড়ি রাজনীতির নাম করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেছিলেন, তাকে আঁকড়ে ধরেছেন মোদী ক্ষমতায় থাকার জন্য।
Advertisement



