দীপংকর মান্না
হাওড়ার আমতা প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন বন্দর। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যে আমতার উল্লেখ পাওয়া যায়। বন্দর অবলুপ্ত হয়েছে বটে, তবে নাব্যতা হারিয়ে দামোদর নদ সেই স্মৃতি বহন করে চলেছে। ধীরে ধীরে প্রাচীন জনপদ ক্রমেই উন্নতির দিকে। আমতার কিছুটা অংশ, মূলত আমতা ও সিরাজবাটী গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে আমতা শহরে পরিণত হয়েছে। এখনও বেশিরভাগ অংশ গ্রামীণ আমতা।
Advertisement
শহর ও গ্রামীণ আমতাকে ঘিরে রেখেছে এক নদী, নানা খাল, নানা বিল ও নানা হ্রদ বা দহ। আমতা দিয়ে বহমান দামোদর নদ ছিল একসময় প্রবাহিনী। নদীকেন্দ্রিক গড়ে ওঠে বন্দর ও ব্যবসা বানিজ্য। আমতা ও বেতাই বন্দরের ছিল খুব নামডাক। খ্যাতি ছিল সুদূর। নামডাক ছিল নওপাড়া ও রসপুর বন্দর। আমতা বন্দর দিয়ে সুদূর তাম্রলিপ্ত, নবদ্বীপ, মুর্শিদাবাদ, কাশিমবাজার, রাণীগঞ্জ প্রভৃতি স্থানের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে ওঠে। হিজলী থেকে বড় বড় নৌকায় আসতো লবণ, রাণীগঞ্জ থেকে আসতো কয়লা। বন্দর কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে নানা জীবিকা, যেমন নৌকা তৈরি ও মেরামত, পালকি তৈরি, ওজনদার, দালাল ইত্যাদি। আমতার নৌকা ও পালকির ছিল খুব কদর। আওড়গাছি গ্রামে তৈরি এক পালকি সযত্নে রাখা আছে খোড়প হাই স্কুল সংগ্রহশালায়। শুধু তাই নয় ঐ সংগ্রহশালায় দেখা যায় অবলুপ্ত কাঠের ‘বিষকাষ্ঠ’, তালপাতার ‘পেখে’, চ্যাটা’, ‘চেটাই’, ‘লন্ঠন’ ইত্যাদি।
Advertisement
নাব্যতা হারিয়ে দামোদর নদ আজও আমতা দিয়ে প্রবাহিত। বর্ষায় দেখা যায় দামোদরের ভয়ঙ্কর রূপ। ভয়ঙ্কর রূপ দেখা যায় মান্দারিয়া খালে। ১৯৮১ সালে দামোদরের বুকে গড়ে ওঠে দামোদর সেতু বা আমতা সেতু। যার পোষাকি নাম কবি রায়গুণাকর ভারত চন্দ্র সেতু। আমতার বিখ্যাত জলাভূমি কান্দুয়ায় মাঠ। কান্দুয়া খাল-নালায় ঘেরা কান্দুয়া মাঠ আজও বিস্ময়।
নদী, নানা খাল, নানা নালা ঘেরা আমতা জুড়ে দেখা যায় নানা হ্রদ বা দহ। পাশাপাশি দেখা যায় নানা মাহাত্ম্য ভরা পুকুর। আমতার ‘মেলাই পুকুর'(দেবী মা মেলাইচন্ডী-র নামে), সিরাজবাটীর ‘পদ্ম পুকুর’ (কথিত আছে সিরাজদৌল্লার অস্থায়ী সিরাজবাটীর পুকুরে পদ্ম চাষের নামে), চন্দ্রপুর গ্রামে ‘পীর পুকুর’ (পীর হজরত মাদার শাহ রহমত উল্লাহ-র নামে), বসন্তপুর গ্রামে ‘রানী পুকুর’ (রায়বাঘিনী রানী ভবশঙ্করী-এর নামে), গুজারপুর গ্রামে ‘পঞ্চানন্দ’ (পঞ্চানন্দ দেবতার নামে) ও ‘শিব’ পুকুর, সোমেশ্বর গ্রামে ‘দামোদর পুকুর’ (দামোদর দেবতার নামানুসারে), ছোট কলিকাতা গ্রামে ‘নীল পুকুর’ (সংশ্লিষ্ট গ্রামে অবলুপ্ত ‘নীলকুঠি’র নামে), সড়িয়ালা গ্রামে ‘জানা পুকুর’ (গল্পে আছে পুকুরের এক পাড় দিয়ে রথের চাকা নেমেছিল), উদং গ্রামে ‘মনসা পুকুর’ (মনসা দেবতার নামে), রাণাপাড়া গ্ৰামে ‘চাঁদনী পুকুর’,পানপুর ‘মালি পুকুর'(জমিদারদের মালির নামে) ও ‘কোচো পুকুর’, ভান্ডারগাছা গ্ৰামে ‘সিংহবাহিনী পুকুর'(সিংহবাহিনী দেবতার নামে), ‘মানুষ মারি পুকুর’ ও ‘সেপাইদিঘি পুকুর'(সেপাইদের থাকার নামে) খড়দহ গ্ৰামে ‘দাউকো পুকুর’ ও ‘কালকে পুকুর’, খোড়প গ্রামে ‘কালী পুকুর’ (শ্মশান কালী মাতার নামে), ও ‘শিব পুকুর’ (শিব দেবতার নামে), গাজীপুর গ্রামে ‘হাট পুকুর’ (সংশ্লিষ্ট গ্রামের প্রাচীন হাটের নামে), তাজপুর গ্রামে ‘গৌরী শঙ্কর’ বা ‘গৌর শঙ্কর পুকুর’ (গ্রামের বিখ্যাত ফুলেশ্বর দেবতার নামে), ‘বেগম তালোয়ার পুকুর’ (বেগমরা স্নান করার নামে) বেশ পরিচিত নাম।
ইতিহাস মোড়া নানা পুকুরের পাশাপাশি আমতা জুড়ে দেখা যায় নানা বিখ্যাত হ্রদ বা দহ। জগন্নাথপুর গ্রামে ‘মানুষমারি দহ’ (কোনও একসময় মানুষের মৃত্যুর নামে), ‘ধোপা দহ’ (ধোপা পাড়া ও কাপড় কাঁচার নামে) ও ‘শিব দহ’ (শিব দেবতার নামে), বড়মহরা গ্রামের ‘ধোবা দহ’ (ধোবাদের কাপড় কাচার নামে) ও ‘কালী দহ (কালী দেবতার নামে), দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর গ্রামে ‘দুর্গা দহ’ (দেবী দুর্গার নামে), তাজপুর গ্রামে ‘বালি দহ’ (বালি থাকার নামে)-এর কথা মানুষের মুখে মুখে।
তবে অন্যতম ও কিংবদন্তি ‘দাদখালি দহ’। ছোটমহরা- মল্লগ্রাম- চাকপোতা- জগন্নাথপুর লাগোয়া ৫১ বিঘার ‘দাদখালি দহ’ আমতার বিস্ময়! কিংবদন্তি এই ‘দহ’ ‘দাদখালি দ’ নামে পরিচিত।
কৃষ্ণ থেকে কেষ্ট, কেষ্ট থেকে কানুর মতো এখানে ‘দিঘি’ থেকে ‘দহ’, ‘দহ’ থেকে হয়েছ ‘দ’। ‘দ’ মানে বড় জলাশয়। ‘দাদখালি দহ’ বড় এক জলাশয়। ‘দাদখালি দহ’ নিয়ে চালু আছে মজার মজার কিংবদন্তি। জলের নিচে বাস করে যক্ষর দল। কোনও এক সময়ে দ’য়ের বাঁধ দিয়ে পালকি করে যাচ্ছিল নতুন বর-কনে। সঙ্গে বাজনার দল। যক্ষরা আবদার করে বর-কনে দেখবে। কাহাররা (পালকি বাহক) নামায়নি পালকি। রেগে যায় যক্ষের দল। তাই তারা বর-কনে সহ সকলকে নামিয়ে নেয় জলের তলায়। গভীর রাতে তাই নাকি শোনা যেত বাজনার শব্দ। কিংবদন্তি যাই থাক জলের নিচে যে মন্দির ও গাছ আছে তার প্রমাণ পেয়েছে এলাকাবাসী। বছর চল্লিশ আগে টানা জাল দেওয়ার সময় জাল আটকে যায় গাছে। আনতে হয় ক্রেন। নামাতে হয় ডুবুরি। উঠে আসে কিছু ফসিল।
কেন নাম ‘দাদখালি দহ’, সঠিক ব্যাখ্যা মেলেনি। যতদূর জানা যায়, আগে এলাকাটি ছিল বন- বাদাড়ে ভর্তি ‘খালি’ স্থান। কোন এক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে তৈরি হয় ‘খাদ’। ক্রমে খাদ রূপ পায় বড় জলাশয়ে। ‘খালি’ জায়গা থেকে দাদখালি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষকদের লেখা পড়ে জানা যায়- পুকুর তৈরি হয় কেটে বা খনন করে। হ্রদ বা দহের সৃষ্টি জলের স্রোতে বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে যে ‘খাদ’ বা ‘দহ’ হতে পারে তা দেখা যায় ১৯৭৮ সালে। ওই বছর বাংলা জুড়ে ভয়াবহ বন্যায় দাদখালি দ’য়ের পাশ্ববর্তী বাঁধের ‘কালভার্ট’ ভেঙে সৃষ্টি হয় নতুন ‘খাদ’। এই ‘খাদ’ টি ‘ছোট দহ’ নামে খ্যাত।
সে যাই হোক নস্টালজিক রোমাঞ্চকর ‘দাদখালি দহ’। দয়ের স্বচ্ছ ফটিক জল, শতশত ডাহুক, পানকৌড়ি সহ নানা পাখির লাফালাফি ব্যস্ত সময়কেও কেড়ে নেয়ে কিছুক্ষণ। বর্ষায় দাদখালি দ’য়ের অপরূপ জলরাশি মনমুগ্ধকর। শীতে নানা পরিযায়ী পাখির মধুর কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙে গ্রামের পর গ্রাম।
আর মাছ তো আছেই। বড় বড় রুই -কাৎলা দ’য়ের পরম সম্পদ। অলঙ্কার লোভনীয় খয়রা- মৌরলা-সরপুঁটি। একটা সময়ে এই দ’য়ে পাওয়া যেত বড় বড় চিত্র ও ভেটকি। অবলুপ্ত হয়েছে সুস্বাদু অমলেশ ও বাঁশপাতা মাছ। বর্ষায় হাত ছিপে দু’কেজি তিন কেজি। হুইলে আট কেজি দশ কেজি। পাকা ছিপেলরা খুপি বা খোঁপে ধরতে পারে আরও বড় মাছ। এই মাছ ধরার জন্য লাগে না কোনও পয়সা। বর্তমানে ‘দাদখালি দহ’ লিজে চলে। গোটা ‘দ’জুড়ে মাছ ধরার জন্য আছে ব্যক্তিগত শতাধিক বাঁশের মাচা। ছিপ ফেলতে এলে লিজ ও মাচার মালিকের সঙ্গে আগেভাগে কথা বলে নেওয়াই ভাল। শহর আমতা থেকে হেঁটে, অটো বা টোটোয় ‘দাদখালি দহ’ আসা যায় সহজেই। পিকনিক করার ইচ্ছা থাকলে দয়ের নিকটবর্তী ‘বনবীথি পার্কে’ যাওয়া যেতে পারে।
Advertisement



