দেবপ্রিয় বাগচী
Advertisement
সাত পাঁচ
Advertisement
দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘সাত পাঁচ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি। সম্পাদক শর্বাণী রঞ্জন কুণ্ডু বলেছেন, ‘আমরা যারা দিল্লিতে থাকি, তাদের কিছু সমস্যা আছে। আমরা আমাদের অভ্যস্ত সামাজিক পরিমণ্ডল পাই না। তবে মানুষ ঠিকই নিজের মতো করে একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করতে সচেষ্ট হয়। কেউ গান, কেউ নাটক করে, কেউ লেখালেখি করে। নিজেদের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করে নেয়। দিল্লিতে বসবাসকারী বাঙালি নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রাখতে এসবই করেছে।
যদিও আমাদের কলকাতামুখিনতা পুরোপুরি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি, তবু কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গকে অবজ্ঞা না করেও অনেক কিছুই করে উঠতে পেরেছি।’ আলোচ্য সংখ্যাটি মূলত সাতজন কবির পাঁচটি করে কবিতার একটি সংকলন। এই সংখ্যার কবিরা হলেন সুপ্রভাত সরকার, অজিত বাইরি, গৌতম দাশগুপ্ত, শর্বাণী রঞ্জন কুণ্ডু, প্রাণজি বসাক, অপর্ণা আচার্য ও সঞ্জীবন রায়। দিল্লির কবিদের পাশাপাশি কলকাতার কবিরাও এখানে অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন।
প্রবীণ কবি সুপ্রভাত সরকারের কবিতায় রয়েছে এক ব্যাপ্ত জীবনের উপলব্ধি। তিনি লিখেছেন, ‘খুলে যায় জীবনপ্রান্তে/ একা যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা আর অন্ধকারের,/ অনাদিকাল গোরস্থানে, কবরের সারিতে/ মৃত্যুই একমাত্র অবিনশ্বর/ ইহলোকে।’
অজিত বাইরি বাংলা কবিতায় পরিচিত নাম। ‘সংকেত’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘বাতি হাতে ছুটছো পথ থেকে পথে/ অন্ধকার তবু কাটে কই?/ এ অন্ধকার খনির অন্ধকারের থেকেও নিশ্ছিদ্র।’
দিল্লির বাসিন্দা গৌতম দাশগুপ্তর কবিতায় ছোট ছোট চিত্রকল্পের মধ্যে মিশে আছে তীব্র শ্লেষ। ‘হাসির বল্কলে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘দুঃখকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে/ বার্নারের বুকে/ নীল ফুল হয়ে বসে থাকে/ অন্ধকার রঙের/ নেকড়ে বাঘ।’
শর্বরী রঞ্জন কুণ্ডু ‘আজকের আমি তুমি’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি একজন হিন্দু।/ আমি একজন মুসলমান।/ আমি একজন শিখ।/ আমি একজন খ্রিস্টান।/ এইসব পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসাই বিধেয় আজ।/ এইসব পরিচয় বর্তমানে অর্থহীন।/ এ শুধু এক প্রতিবন্ধকতা।’ বিভাজনহীন মানব সমাজের কথা বলতে চেয়েছেন কবি। যেখানে ধর্মীয় পরিচয় সমাজের মধ্যে তৈরি করছে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা, গোষ্ঠীবদ্ধতায় যেখানে তৈরি হয় কেবলই বিবাদ কিংবা বিদ্বেষ, সেখানে মানুষ তার স্বকীয়তা হারায়। আজকের পরিস্থিতিতে এই ধরনের ভাবনা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ‘নির্বিস্ময়’ কবিতাটিও তাঁর পরিণত জীবনবোধের প্রতিফলন। তবে সেই তুলনায় তাঁর প্রথম তিনটি কবিতা যথেষ্ট দুর্বল মনে হয়।
প্রাণজি বসাক দীর্ঘদিন ধরে কবিতা লিখছেন। তাঁর কবিতা দিল্লি এবং বাংলার পাঠকদের কাছে পরিচিত। ‘শেষ প্রার্থনায়’ কবিতায় তিনি লিখছেন, ‘তোমার ঠোঁটে অস্ফুট উচ্চারণে প্রার্থনা মন্ত্র/ নিসর্গের একান্ত প্রয়াসে প্রকৃতির নিমগ্ন পাঠ/ সচরাচর এদিকে জনমানস কেউ আসে না/ তোমার অকূল আকুতি ঝর্নার জলে স্নাত—’। প্রাণজি বসাকের কবিতার উচ্চারণ অনেকটা এরকমই শান্ত, অনুভূতিময় ও নিমগ্ন।
অপর্ণা আচার্য দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতেই কবিতাচর্চা করছেন। তাঁর কবিতার বেশকিছু চিত্রকল্প মনকে স্পর্শ করে। যেমন, ‘বন্যা উঠেছে মাথায়/ কপাল ছুঁয়ে ব্রহ্মতালু দাঁড়িয়ে/ নাগাল ছুঁড়ে দিচ্ছে এদিক ওদিক।/ জলতলায় পায়ের আশ্রয়ে বিরাট ধাঁধা/ টলমল নাভিমূলে খামচে ধরেছে গভীর আলেয়া।’
সঞ্জীবন রায়ের কবিতায় রয়েছে কিছুটা স্মৃতিকাতরতা, রয়েছে স্বপ্ন ও সংবেদনশীল চিত্রকল্প। তিনি লিখেছেন, ‘মনে পড়ে, একদিন আমাদেরও স্বপ্ন ছিল তারাদের নামিয়ে আনার/
ঘুম-ভেঙে এভাবেই শুরু হয় দিন, স্মৃতিজ্বরে।’
পরিচ্ছন্ন ছিমছাম একটি তিন ফর্মার সংকলন। ভালো লাগে মৃণাল শীলের আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদটি। উল্লেখ করা দরকার, কবি বন্ধুদের মধ্যে নিঃশুল্ক বিতরণের জন্য এই কবিতা সংকলন।
সাতপাঁচ
সম্পাদক : শর্বাণী রঞ্জন কুণ্ডু
চিত্তরঞ্জন পার্ক, নিউ দিল্লি
এখন তমোহা
দশ বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে চলেছে ‘এখন তমোহা’ পত্রিকাটি। বর্তমান সংখ্যাটিতে ছোট গল্প লিখেছেন তৃষ্ণা বসাক এবং দুটি প্রবন্ধ লিখেছেন শংকর ব্রহ্ম ও হৈমন্ত্রী ভট্টাচার্য। শংকর লিখেছেন কিউবার কবি হোসে জোয়াকুইন পালমা লাসো-কে নিয়ে। এই কবির জন্ম ১৮৪৪ সালে। যৌবনে তিনি কিউবায় ১০ বছরের যুদ্ধে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কাজ করেছিলেন।
তাঁর সম্পর্কে লেখাটি আগ্রহীদের ভালো লাগবে।
‘খাদ্য আন্দোলন: যমুনাবতীদের নিভন্ত চুল্লীতে অগ্নিবিপ্লব’ শীর্ষক প্রবন্ধে হৈমন্তী ভট্টাচার্য তুলে এনেছেন স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটভূমিটিকে। সে সময় কবিতা হয়ে উঠেছিল শাণিত অস্ত্র। তৈরি হয়েছিল হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীদের মর্মভেদী গণসঙ্গীত। কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতায় উঠে এসেছে খাদ্যের দাবিতে কোচবিহারে পুলিশের গুলিতে মারা যাওয়া ১৬ বছরের এক কিশোরীর কথা। বিখ্যাত সে কবিতা— ‘নিভন্ত এই চুল্লীতে মা একটু আগুন দে।’ আলোচ্য প্রবন্ধে উঠে এসেছে কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কথাও। এসেছে গণসঙ্গীত শিল্পী অজিত পাণ্ডের গাওয়া গানের কথাও।
আলোচ্য সংখ্যাটিতে মূলত প্রাধান্য পেয়েছে কবিতাই। এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা পড়ার সুযোগ ঘটেছে এখানে। তবে পূর্ণেন্দু পত্রী, ভাস্কর চক্রবর্তী বা বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের কবিতা পুনর্মুদ্রিত কিনা তার কোনো উল্লেখ এখানে নেই। এই সংখ্যায় বাংলাদেশের বিখ্যাত কবি আবুল হাসানের একটি বিখ্যাত কবিতা এখানে কোনো উল্লেখ ছাড়াই পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। এই ধরনের কাজ সম্পাদনার মান বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে সংশয় তৈরি করে। জয় গোস্বামী, মৃদুল দাশগুপ্ত, রমা ঘোষ, রেহান কৌশিক, প্রণব বসুরায় প্রমুখের পাশাপাশি তরুণ কবিদের কবিতাও যথেষ্ট ভালো লাগে। উত্তম দত্তর কবিতার অনুরাগীর সংখ্যা ইদানিং যথেষ্ট ভালোই। তাঁর কবিতা ‘বহুদিন পত্রহীন’ খুব ভাল লাগে, ‘একদিন চলে যাব তোমাদের দেশে/ বিষণ্ণ নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকব সারাদিন/ শ্মশান-কাঠের মতো।/ শ্যাওলায় ভরে যাবে পুড়ে যাওয়া সমস্ত শরীর।’
তৈমুর খান, মন্দাক্রান্ত সেন প্রমুখ পরিচিত কবিদের পাশাপাশি তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়, জয়াশিস ঘোষ, শুভদীপ মাইতি আলাদা করে নিশ্চয়ই পঠিত হবেন। অন্য যাঁদের নাম এখানে উল্লেখ করা সম্ভব হল না, তাঁদের কবিতার প্রতিও পাঠকেরা আগ্রহী হবেন, এ বিষয়ে সংশয় নেই। পত্রিকার প্রচ্ছদভাবনা হিমাদ্রি বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সম্পাদক সুরজিৎ সেনগুপ্তের লেখা ‘আমাদের কথা’য় মুদ্রণ প্রমাদ যথেষ্ট দৃষ্টিকটূ। এ বিষয়ে আরেকটু মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
এখন তমোহা
সম্পাদক : সুরজিৎ সেনগুপ্ত
রিষড়া, হুগলি
মূল্য: ৪০ টাকা
Advertisement



