অবশেষে ভারতের রেল মানচিত্রে জায়গা করে নিল মিজোরাম রাজ্য। বহু প্রতীক্ষিত ভৈরবী-সাইরাং রেলপথের উদ্বোধন করে শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করলেন, উত্তর-পূর্বকে অবহেলা করেছে বিরোধীরা। শুধু ভোট যেখানে সেখানেই তাঁদের নজর, অন্য কোনও কিছুর উপর গুরুত্ব নেই।
জানা গিয়েছে, শনিবার সকালে বৃষ্টির মধ্যে হেলিকপ্টারে অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছতে না পারলেও, আইজল বিমানবন্দর থেকেই প্রকল্পের সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে বিরোধীদের রাজনৈতিক আক্রমণ করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘বহু বছর ধরে কিছু রাজনৈতিক দল কেবল ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করেছে। তারা সেইসব জায়গাতেই নজর দিয়েছে, যেখানে আসন বেশি ছিল। এর ফলে মিজোরাম-সহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত ভুগেছে।’ তিনি দাবি করেন বিজেপি ভিন্ন নীতি নিয়ে চলে। মোদী বলেন, ‘যাঁরা একসময় অবহেলিত ছিলেন, তাঁরাই এখন সামনের সারিতে। যাঁদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, তাঁরাই আজ মূল স্রোতে যুক্ত হয়েছেন।’
Advertisement
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রমণের পাল্টা জবাব দিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসও কটাক্ষ করেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, ‘আমি খুশি তিনি দু’বছর পরে অবশেষে মণিপুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরও আগেই সেখানে যাওয়া উচিত ছিল। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, তিনি এতদিন ধরে মণিপুরে সংঘর্ষ এবং এত মানুষের হত্যার সুযোগ দিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের এমন ইতিহাস নেই। তিনি যে দলেরই হোন, মানুষের দুঃখে সেখানে পৌঁছানোর কথা। স্বাধীনতার পর থেকে তাই হয়ে এসেছে।’
Advertisement
প্রসঙ্গত, পাহাড়ঘেরা মিজোরামে রেল পৌঁছনো এক সময়ে ছিল দুঃস্বপ্ন। দুর্গম ভৌগোলিক পরিস্থিতি আর কঠিন পাহাড়ি পথকে জয় করে এবার নীল পাহাড়ের দেশকে রেলপথ দিয়ে জুড়ে দিল ভারতীয় রেল। রেলের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অধীনে উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার অঙ্গ হিসেবেই এই রেল প্রকল্পের সূচনা করা হয়। বহু দশক ধরে রেল পরিষেবা থেকে বঞ্চিত ছিল মিজোরাম। এখন এই রেল লাইনের হাত ধরে দেশের গোটা রেল পথের সঙ্গে জুড়ে গেল পাহাড়ঘেরা রাজ্যটি।
এদিনই আইজল থেকে দিল্লির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে রাজ্যের প্রথম রাজধানী এক্সপ্রেস চালু হয়েছে। তার নাম সাইরাং-দিল্লি রাজধানী এক্সপ্রেস। অন্যদিকে, ভৈরবী-সাইরাং রেল প্রকল্পে খরচ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৭১ কোটি টাকা। ৫১.৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেললাইনের পথে রয়েছে ৪৮টি সুড়ঙ্গ, ৫৫টি বড় সেতু, ৮৭টি ছোট সেতু, ৫টি রোড ওভারব্রিজ এবং ৬টি রোড আন্ডারব্রিজ। এর মধ্যে ১৯৬ নম্বর সেতুটি একেবারেই অনন্য— যার উচ্চতা ১১৪ মিটার। অর্থাৎ কুতুব মিনারের থেকেও ৪২ মিটার উঁচু। এই রেলপথে সুড়ঙ্গগুলির নির্মাণে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। রেল দপ্তর সেটি শুধু কংক্রিট আর পাথরের গা ছমছমে কাঠামোই রাখেনি; সেই সঙ্গে স্থানীয় শিল্পকলা আর মিজো সংস্কৃতির নিদর্শন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
রেল দপ্তরের দাবি, জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুর–শ্রীনগর–বারামুলা রেললাইন প্রকল্প যেমন এক অনন্য নজির, তেমনই মিজোরামের এই ভৈরবী–সাইরাং লাইনও উত্তর-পূর্ব ভারতে আর এক নতুন মাইলফলক। বিরামহীন রেল উন্নয়ন আর জনসংযোগ বৃদ্ধিই এখন ভারতীয় রেলের মূল লক্ষ্য।
এই রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে রাজ্যের অর্থনীতি ও সংযোগে বড়সড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। এই রেললাইন চালুর ফলে মিজোরামের অভ্যন্তরে যাতায়াত বা যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজ হল। পাশাপাশি অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে যোগাযোগ আরও বৃদ্ধি পেল। এমনকি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করা হচ্ছে। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প— সব কিছুতেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিল এই রেল সংযোগ।
ভারতীয় রেল সূত্রে জানানো হয়েছে, যাত্রীদের সুবিধার জন্য প্রতিটি স্টেশনে আধুনিক পরিষেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পর্যটকরাও এর থেকে সুবিধা পেতে চলেছেন।
Advertisement



