বাংলার দোল

হাননান আহসান

শিয়রে দোল৷ রাত পেরোলেই শুরু হয়ে যাবে প্রাণের উৎসব৷ খুশির সীমাহীন উচ্ছ্বাস ও আনন্দের রঙ খেলা৷ বাঙালি সনাতনীদের বারো মাসে তেরো পার্বণ৷ তারপরেও শেষ বলে কিছু নেই৷ বাঙালি জীবনে দুর্গাপুজো সবচেয়ে বড়ো কলেবরের উৎসব৷ দোল কোনো অংশে কম যায় না৷ একে বলে হয় দোল পূর্ণিমা বা দোল উৎসব৷ দোল আবার রঙের উৎসব৷ ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদ্যাপিত হয়৷ এর অন্য নাম দোলযাত্রা৷ ফাল্গুনী পূর্ণিমাকেও দোল পূর্ণিমা বলা হয়৷ এই পূর্ণিমা তিথিতে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন৷ তাই দোল পূর্ণিমাকে গৌরী পূর্ণিমাও বলে৷ এই তিথিতে বৃন্দাবনে আবির ও গুলাল নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ, রাঁধা ও তার সখীরা হোলি খেলেছিল৷ সেই ঘটনা থেকে দোল খেলার সূচনা হয়৷

বাঙালি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে এই দিনটির জন্য৷ কচিকাঁচাদের উৎসাহ উদ্দীপনা সবচেয়ে বেশি৷ গ্রাম-শহর সব জায়গায় একই ছবি৷ কে কাকে রঙ মাখাবে তার প্রতিযোগিতা চলে৷ রাস্তাঘাটে বাচ্চারা রঙের পিচকারি নিয়ে আনন্দ করে৷ সামনে কাউকে পেলে আর রক্ষে নেই৷ রামধনু রঙে রাঙিয়ে দিয়ে তবে ক্ষান্ত হবে৷ ছেলে-বুড়ো সবাই এই বিশেষ দিনে আনন্দ করে৷ বাড়িতে ভালো-মন্দ রান্না হয়৷


খাওয়া আর আনন্দ, ভারী মজা৷ এইসময় ঋতুও সেজে ওঠে৷ চারদিকে কৃষ্ণচূড়া ও অন্য হরেকরকম ফুলে প্রকৃতি স্নিগ্ধ কোমল হয়ে ওঠে৷ মনোমুগ্ধকর পরিবেশ৷ সার্বজনীন এই দোল কিন্ত্ত প্রাচীন উৎসবের একটি৷
পৌরাণিক ও ধর্মীয় কাহিনি অনুসারে, দোল উৎসব রাজা হিরণ্যকশ্যপের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে৷ যিনি ছিলেন বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদের পিতা৷ তিনি নিজেকে অত্যন্ত শক্তিশালী মনে করতেন এবং কঠোর তপস্যা করার পর আরো ক্ষমতাবান হওয়ার বরও পেয়েছিলেন৷ কিন্ত্ত রাজা তার ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন৷ শুধু তাই নয়, তিনি মানুষকে ভগবানের মতো তাকে পুজো করতে বলতেন৷ কিন্ত্ত পুত্র প্রহ্লাদের স্বভাব পিতার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল৷ তিনি দিনরাত ভগবান বিষ্ণুর ভক্তিতে মগ্ন থাকতেন৷ প্রহ্লাদের স্বভাব দেখে বাবা হিরণ্যকশ্য রাগ করতেন৷ তিনি প্রহ্লাদকে বহুবার ভগবান বিষ্ণুর উপাসনা করতে নিষেধ করেন৷ পরিবর্তে তার পিতাকে পুজো করতে বলেছিলেন৷ কিন্ত্ত প্রহ্লাদ বাবার কথা শোনেনি৷ অবশেষে হিরণ্যকশ্যপ প্রহ্লাদকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন৷ তিনি তার বোন হোলিকাকে নির্দেশ দেন যাতে সে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে বসে৷

কারণ বরদান হিসেবে হোলিকাকে আগুন পোড়াতে পারে না৷ কিন্ত্ত ভগবানের মহিমা এমন ছিল যে, হোলিকা আগুনে পুডে় ছাই হয়ে গেল এবং প্রহ্লাদের কিছুই হলো না৷ কারণ প্রহ্লাদ হোলিকার কোলে বসেও ভগবানের নাম জপ করতে থাকেন৷ এরপর ভগবান বিষ্ণু হিরণ্যকশিপুকে বধ করেন৷ এই কারণেই দোলর উৎসবটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মন্দের উপর ভালোর জয় হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে এবং বুডি়র ঘর বা ন্যাড়া পোড়া দোলের একদিন আগে পালন করা হয়৷

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ভারতবর্ষের প্রাচীন আর্য জাতি রঙ খেলার সূচনা করেছে৷ আবার এমনটাও জানা গেছে, খ্রিস্টের জন্মেরও কয়েকশো বছর আগে থেকেই হোলি উদযাপিত হয়ে আসছে৷ প্রাচীনকালের পাথরে খোদাই করা ভাস্কর্যে নাকি এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছিল৷ দোলের কথা লেখা আছে পবিত্র গ্রন্থ বেদ এবং পুরাণেও৷ ৭০০ শতকের দিকে রাজা হর্ষবর্ধনের সমsয়ে সংস্কৃত ভাষায় লেখা একটি নাটিকাতে হোলি উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়৷ পরে বিভিন্ন মন্দিরের গায়ে খোদাই করা চিত্রকর্মে হোলি খেলার নমুনা ফুটে উঠেছে৷ লখনৌর নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ কলকাতার মেটিয়া বুরুজে পালিয়ে এসে এখানে পাত্র-মিত্র নিয়ে হোলি খেলা মেতে উঠতেন৷

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরে অবস্থিত শান্তিনিকেতন৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনের দ্বিতীয়ার্ধের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন তার পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত এই শান্তিনিকেতনের আশ্রমে৷ এখানে বসেই বিশ্বকবি তার অসংখ্য সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি করে গেছেন৷ প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনে নাচ-গান ইত্যাদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হতো বসন্তকে৷ পরপবর্তীতে দোলযাত্রা যেহেতু বসন্তে উদযাপিত হয়, তাই দোল ও বসন্তবরণ একইসঙ্গে বসন্তোৎসব হিসেবে ধুমধাম করে উদযাপন করা শুরু হলো শান্তিনিকেতনে৷ ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং উদ্বোধন করে যান এই উৎসবের৷ এছাড়া দোলের পূর্ব রাতে হোলিকাদহনের মতোই ‘বহ্নি উৎসব’ পালন করা হয়৷