পশ্চিম এশিয়ায় চলতে থাকা সংঘাত ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সামরিক অভিযানের জেরে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মার্কিন রাজনীতিবিদদের একাংশ। একই সঙ্গে সাবেক সেনাকর্তারাও সতর্ক করেছেন, ইরানের ভূপ্রকৃতি এবং সামরিক কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড় ও মরুভূমিতে ঘেরা ইরানের মাটিতে স্থলবাহিনীর অভিযান চালানো আমেরিকার জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। এই ধরনের অভিযানে সাধারণত কৃত্রিম উপগ্রহ এবং নানা আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে শত্রু দেশের ভিতরে প্রবেশ করে মার্কিন সেনা। কিন্তু বাস্তব রণক্ষেত্রে সেই হিসাব অনেক সময়ই পাল্টে যায়। অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি নিজেদের ভূখণ্ডের প্রতিটি এলাকা হাতের তালুর মতো চেনে। ফলে গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে তারা মার্কিন সেনাকে বড় ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, ইরানের হাতে ভাড়াটে বাহিনীও রয়েছে, যারা গোপনে যুদ্ধ চালানোর ক্ষেত্রে দক্ষ। সেই কারণে স্থলযুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সৈন্যের প্রাণহানি ঘটতে পারে। এই ঝুঁকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেবেন কি না, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। ইতিমধ্যেই এই সংঘাতের বিপুল ব্যয়ভার মার্কিন প্রশাসনের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সূত্রের খবর, যুদ্ধ চালাতে প্রতিদিন প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে আমেরিকার।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরেই ইরান যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। পেন্টাগনের কাছ থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি জানার পর অনেক রাজনীতিবিদ মনে করছেন, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে। তখন পরিস্থিতি ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো জটিল হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি যুদ্ধের বিপুল ব্যয়ের বোঝাও শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষকেই।
সম্প্রতি একটি জনমত সমীক্ষা চালায় মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন। সেই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট নন প্রায় ৫৯ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। আবার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের মত, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রেসিডেন্টের পার্লামেন্ট কংগ্রেসের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তা ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস বলছে, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকা। ১৯৬৫ সালের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওই দেশে বিপুল সংখ্যক সৈন্য ও অস্ত্র পাঠানো হয়। সংঘর্ষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সৈন্যের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩ সালে সেখান থেকে বাহিনী প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন। তত দিনে প্রায় ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের ট্যুইন টাওয়ারে জঙ্গি হামলার পর আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা। প্রথম দিকে সাফল্য এলেও প্রায় দুই দশক ধরে সেখানে যুদ্ধ চালাতে হয় মার্কিন বাহিনীকে। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনাকে অনেকেই বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্রের একটি বড় কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েলের সঙ্গে যৌথ ভাবে ইরানে আক্রমণ চালায় মার্কিন বাহিনী। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনি নিহত হন বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় নিহত হন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং সেনাপ্রধান আব্দুল রহিম মৌসাভি। তখন ওয়াশিংটনের অনেকেই মনে করেছিলেন, ইরানের ইসলামীয় প্রজাতন্ত্রের পতন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তখন আত্মবিশ্বাসী সুরে বলেছিলেন, ‘ওরা আলোচনার কথা বলেছিল, কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।’ তিনি আরও জানিয়েছিলেন, লাগাতার বোমাবর্ষণের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হবে। কিন্তু মার্চের শুরু থেকেই যুদ্ধের মোড় ঘুরতে শুরু করে। ইরানের আইআরজিসি পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন এবং ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলি সেই আঘাতে কেঁপে ওঠে।
ইরানের দাবি, তাদের হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলায় আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। বাহরিনে মার্কিন নৌঘাঁটিতে আগুন লাগে বলেও খবর। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেও একটি ড্রোন আছড়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তেহরানের দাবি, কাতারে মোতায়েন থাকা একটি শক্তিশালী মার্কিন রেডার ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে। এই রেডারটির পাল্লা প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার। মূল্য প্রায় ১১০ কোটি মার্কিন ডলার বলে জানা গিয়েছে। এর মধ্যেই পারস্য উপসাগরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের উপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিও করেছে ইরান। যদিও পেন্টাগন জানিয়েছে, রণতরীটি অক্ষত রয়েছে। তবে সূত্রের খবর, নিরাপত্তার কারণে সেটির অবস্থান বদল করা হয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। পারস্য ও ওমান সাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবহণ হয়। ফলে এই পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে তার অর্থনৈতিক অভিঘাতও বিশ্বজুড়ে পড়বে। ইতিমধ্যেই ইরান যুদ্ধে কয়েক জন মার্কিন সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে এবং তাঁদের দেহ ওয়াশিংটনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এই অবস্থায় স্থলযুদ্ধ শুরু হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন রাজনীতির অন্দরেই প্রশ্ন উঠছে—ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও বাড়ানো হবে, নাকি কূটনৈতিক পথ খুঁজে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবে ওয়াশিংটন। আগামী দিনেই সেই উত্তর স্পষ্ট হতে পারে।