বিক্ষোভ দমনের নামে মারাত্মক ভুল করল মার্কিন অভিবাসন দপ্তর। জানা গিয়েছে, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের নামে নির্বিচারে গুলিচালনায় যে যুবকের মৃত্যু হয়েছে, তিনি কোনও অভিবাসীই নন, তিনি একজন মার্কিন নাগরিক। এই ঘটনাকে ঘিরে আমেরিকা জুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ আর রাজনৈতিক ঝড়। পর পর দু’টি মৃত্যুর ঘটনায় আইসিই-র ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি।
মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন-বিরোধী অভিযানের প্রতিবাদে চলা একটি বিক্ষোভ মিছিলে শনিবার রাতে গুলিচালনার ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৭ বছরের অ্যালেক্স প্রেটি। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিক্ষোভ চলাকালীন আইসিই বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে মিছিল থেকে টেনে বের করে আনেন, মাটিতে শুইয়ে দেন এবং প্রশ্ন করতে করতেই পরপর গুলি চালান। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ঘটনাস্থলে থাকা এক মহিলা আতঙ্কে চিৎকার করে বলেন, ‘এটা কী হচ্ছে?’ কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। মুহুর্মুহু গুলিতে নিথর হয়ে যান অ্যালেক্স।
পরবর্তী তদন্তে প্রকাশ্যে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য— অ্যালেক্স কোনও অবৈধ অভিবাসী নন। তিনি একজন মার্কিন নাগরিক। আইসিই বাহিনীর এই ‘ভুল’ অভিযানে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠছে, অভিবাসন দমনের নামে কতটা নির্বিচার হয়ে উঠেছে এই বাহিনীর কাজকর্ম।
এই ঘটনার আগেও এক মাসের মধ্যে আরও একটি মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। গত ৭ জানুয়ারি মিনিয়াপোলিসেই আইসিই বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু হয় রেনে নিকোলে গুড নামে এক মহিলার। পরপর দুই মৃত্যুর ঘটনায় তৈরি হয়েছে ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া।
এই পরিস্থিতিতে সরব হয়েছেন নিউ ইয়র্কের মেয়র এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধী নেতা জোহরান মামদানি। তিনি সরাসরি আইসিই বন্ধ করার দাবি তুলেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে মামদানি লেখেন, ‘দিনের আলোয় রেনি গুডকে হত্যা করেছে আইসিই। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই তারা অ্যালেক্স প্রেটিকে হত্যা করেছে। তাঁর উপর ১০ বার গুলি চালানো হয়েছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘প্রতিদিন আমরা দেখি কিভাবে মানুষকে তাদের গাড়ি, তাদের বাড়ি, তাদের জীবন থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা এই নিষ্ঠুরতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি না। আইসিই-কে বন্ধ করতেই হবে।’
একটি সাক্ষাৎকারে মামদানি বলেন, ‘আমি মনে করি আমরা যা দেখছি তা ভয়াবহ। মানুষকে বলা হচ্ছে যেন তারা নিজেদের চোখ-কানকে বিশ্বাস না করে। বাস্তবতাকেই অস্বীকার করতে বলা হচ্ছে।’ রেনি গুডের হত্যার ভিডিও দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ‘এটা খুন ছাড়া আর কিছুই নয়।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি আক্রমণ করে মামদানি বলেন, ‘এই ভয় শুধু মিনিয়াপোলিসের নয়, নিউ ইয়র্কের মানুষের মনেও ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষের জীবনকে সন্ত্রাসপূর্ণ করে তোলা হয়েছে।’ তিনি স্পষ্ট জানান, নিউ ইয়র্কের নাগরিকদের সঙ্গে যেন এমন ঘটনা না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই তাঁর দায়িত্ব।
মামদানির দাবি, প্রেসিডেন্টকে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—আইসিই যে তল্লাশি ও অভিযান চালাচ্ছে তা ‘অত্যন্ত ক্রূর ও অমানবিক’। তাঁর কথায়, ‘আমেরিকার মানুষ সত্যি দেখতে চায়, সত্যি জানতে চায়।’
নিহত অ্যালেক্স প্রেটির ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও উঠে এসেছে আবেগঘন তথ্য। আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন রোগীদের দেখাশোনা করতেন তিনি। সহকর্মীদের মতে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত নরম মনের, সংবেদনশীল মানুষ। রেনে নিকোলে গুডের মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতেই তিনি বিক্ষোভ মিছিলে শামিল হয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদেই নেমে আসে তাঁর জীবনের অন্ধকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির নামে যে দমনপীড়নের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা শুধু অভিবাসীদের নয়, সাধারণ নাগরিকদের জীবনকেও বিপন্ন করে তুলছে। আইসিই বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির অভাব এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয় এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
পরপর দু’টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন প্রশ্ন একটাই—অভিবাসন দমনের নামে কি আমেরিকা ধীরে ধীরে একটি আতঙ্কের রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে? আইসিই কি আইনের ঊর্ধ্বে উঠে অমানবিক কাজ করছে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়েই এখন উত্তাল হয়ে উঠেছে আমেরিকা।