দশকের পর দশক ধরে জল্পনা চলছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠলেই এড়িয়ে যেত আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর। অবশেষে তারা নিজেই স্বীকার করে নিল, পৃথিবীর কক্ষপথে (orbit) আমারেকা মারাত্মক অস্ত্র মোতায়েন করেছে। মার্কিন বায়ুসেনার সচিব ট্রয় মেইঙ্ক (Troy Meink) মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (AFA) সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে জানিয়ে দেন, শত্রুপক্ষের আগ্রাসী পদক্ষেপ থেকে মার্কিন সেনাকে রক্ষা করতে এখন কক্ষপথে স্পেস কন্ট্রোল ওয়েপন্স (space control weapons) মজুত রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনও শীর্ষ কর্তা প্রকাশ্যে এমন কথা বললেন।
কী বলেছেন মেইঙ্ক
মেইঙ্কের কথায়, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের সুরক্ষার সংজ্ঞাও বদলেছে। যে কোনও ধরনের হুমকির মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে আমেরিকা কক্ষপথে এমন অস্ত্র রেখেছে যা শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও তার সহযোগীদের রক্ষা করতে সক্ষম। মার্কিন স্পেস ফোর্সের (US Space Force) তরফেও পরে একটি বিবৃতিতে বলা হয়, মহাকাশে আধিপত্য বজায় রাখতে গতিশীল এবং স্ট্যাটিক, দুই ধরনের পদ্ধতিই ব্যবহার করা হয়। প্রতিপক্ষের ক্ষমতাকে ব্যাহত করা, দুর্বল করা, এমনকি প্রয়োজনে ধ্বংস করাও এর অন্তর্ভুক্ত বলে জানানো হয়েছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গিয়েছেন মেইঙ্ক নিজেই। ঠিক কী ধরনের অস্ত্র, কতগুলি অস্ত্র, কোন উপগ্রহ বা প্ল্যাটফর্ম থেকে সেগুলি পরিচালিত হয়, এমনকি সেই অস্ত্রের পরীক্ষা হয়েছে কি না, তার কোনও উত্তর মেলেনি। মেইঙ্কের যুক্তি, খুঁটিনাটি প্রকাশ্যে আনলে প্রতিরোধমূলক কৌশলের (deterrence) কোনও লাভ হবে না। বরং শত্রুপক্ষকে অন্ধকারে রাখাই কৌশলের অঙ্গ।
কেন এখন এই স্বীকারোক্তি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘোষণার নেপথ্যে রয়েছে চিন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান মহাকাশ-শক্তি। দুই দেশই স্যাটেলাইট জ্যামিং প্রযুক্তি এবং কক্ষপথে ঘোরাফেরা করতে সক্ষম ইন্টারসেপ্টর তৈরি করেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রে খবর। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা প্রকাশ্যে আনাই যুক্তিসঙ্গত মনে করেছে ওয়াশিংটন। সেক্রিওর ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের মহাকাশ বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া স্যামসনের অনুমান, মেইঙ্ক সম্ভবত কোনও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের কথা বলেননি। বরং স্যাটেলাইট নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অকেজো করার মতো জ্যামার বা তড়িৎ-চৌম্বকীয় যুদ্ধাস্ত্রের (electronic warfare) দিকেই ইঙ্গিত থাকতে পারে তাঁর কথায়। কারণ কক্ষপথে ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষ হলে যে ধ্বংসাবশেষ তৈরি হবে, তা নিয়ে বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন কর্তারাই।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে
১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি (Outer Space Treaty) অনুযায়ী পরমাণু অস্ত্র বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র কক্ষপথে রাখা নিষিদ্ধ। কিন্তু প্রচলিত অস্ত্র নিয়ে এই চুক্তিতে কোনও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে আইনি দিক থেকে আমেরিকার এই পদক্ষেপ চুক্তিভঙ্গ নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন স্পেস ফোর্সও দাবি করেছে, তাদের কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক আইন এবং যুদ্ধ পরিচালনার আইন মেনেই হয়। তবে চিন ও রাশিয়া বহুদিন ধরেই মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করার একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে, যা বারবার আটকে দিয়েছে আমেরিকা নিজেই। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে এই নিয়ে বছরের পর বছর অচলাবস্থা চলছে।
আশঙ্কা কোথায়
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, এই খোলাখুলি স্বীকারোক্তি নতুন করে মহাকাশ-অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে উস্কে দিতে পারে। চিন ও রাশিয়া এমনিতেই ধরে নিয়েছিল আমেরিকার হাতে মহাকাশে ব্যবহারোপযোগী অস্ত্র (counterspace capability) রয়েছে। তাই এই ঘোষণা তাদের কৌশলে বিশেষ কোনও বদল আনবে না বলেই ধারণা বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির আঙিনায় এটি প্রতিপক্ষকে নিজেদের কর্মসূচি প্রকাশ্যে আনার একটা নৈতিক বাধ্যবাধকতার জায়গা তৈরি করতে পারে। ফলে গোপন প্রতিযোগিতা এবার প্রকাশ্য প্রতিযোগিতায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
অর্থাৎ, সামগ্রিকতারা নিরিখে মহাকাশ এখন আর শুধু বিজ্ঞান আর যোগাযোগের ক্ষেত্র নয়। জিপিএস (GPS), সামরিক নজরদারি থেকে শুরু করে যোগাযোগ ব্যবস্থা, সবটাই নির্ভরশীল উপগ্রহের উপর। সেই উপগ্রহ ব্যবস্থাকে ঘিরেই এবার তৈরি হচ্ছে পৃথিবীর বাইরের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র। সেই যুদ্ধক্ষেত্রে আমেরিকা যে প্রথম পা রেখেছে, তা এখন আর গোপন রইল না।