এক রাতে হাজার ড্রোনের বৃষ্টি: ইউক্রেনের মরণকামড়ে জ্বলছে রাশিয়ার তেলের ডিপো, ছিন্নভিন্ন ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি

Ukraine Fires 1,000 Drones At Russia, St Petersburg Oil Sites Ablaze (Image: Pexels @alesustinau)

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ঘোষিত তথাকথিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা টিকল না এক সপ্তাহও। শনিবার গভীর রাত থেকে রবিবার ভোর পর্যন্ত রাশিয়ার ভূখণ্ডে এযাবৎকালের বৃহত্তম আকাশ-হামলা চালাল ইউক্রেন (Ukraine 1000 drones attack Russia)। এক রাতে হাজারেরও বেশি দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন আছড়ে পড়ল রাশিয়ার বন্দর শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে শুরু করে কৃষ্ণসাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায়। কিয়েভের এই নজিরবিহীন ড্রোন-বৃষ্টিতে দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রধান তেল রফতানি টার্মিনাল, জ্বালানি ডিপো এবং একাধিক বাণিজ্যিক গুদাম। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নিজের শহরে এমন বিধ্বংসী আঘাতের জেরে সাময়িক ভাবে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে পুলকোভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উড়ান চলাচল।

১,০১৫টি ড্রোন

 রবিবার সকালে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত পরিসংখ্যান নিজেই বলে দিচ্ছে ইউক্রেনের এই আক্রমণের তীব্রতা ঠিক কতটা। মস্কোর দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা শনিবার রাতভর রাশিয়ার ১৫টি অঞ্চল, সংযুক্ত ক্রিমিয়া উপদ্বীপ এবং কৃষ্ণসাগরের আকাশে সব মিলিয়ে ১,০১৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে।


 যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক রাতে এত বিপুল সংখ্যক ড্রোন ছোঁড়ার ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন। সমর বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে হাজারের বেশি ড্রোন আকাশে ভাসিয়ে দিয়ে রাশিয়ার র‍্যাডার ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে দিশাহারা করে দেওয়াই ছিল কিয়েভের মূল কৌশল। শত শত ড্রোন মাঝ-আকাশে ধ্বংস হলেও প্রতিরক্ষার জাল ছিঁড়ে বেশ কিছু ড্রোন সরাসরি আঘাত হেনেছে পূর্বনির্ধারিত নিশানায়।<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>🔥 Massive drone assault hits St. Petersburg! Dramatic footage captures the chaos of today’s coordinated attack: * 🏢 The Ozon warehouse completely engulfed in flames * 🌉 A direct drone strike hitting the Ship Fairway Bridge * 🔥 A massive, raging fire consuming the city’s oil terminal The situation is escalating rapidly. Watch the footage below. ⬇️ #Ukraine #StPetersburg #BreakingNews #DroneAttack #Geopolitics</p>&mdash; Ukraine News 🇺🇦 (@Ukrainene) <a href=”https://x.com/Ukrainene/status/2111797412003975407?ref_src=twsrc%5Etfw”>October 18, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>

আগুনের গ্রাসে তেলের ঘাঁটি ও ডেটা সেন্টার

 হামলার সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়েছে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ এবং সংলগ্ন লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে। শহরের গভর্নর আলেকজান্ডার বেগলভ জানিয়েছেন, ড্রোন হানায় সেন্ট পিটার্সবার্গ অয়েল টার্মিনাল এবং তেল ডিপোয় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে (St Petersburg oil terminal blaze)। আগুন নেভাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে। তেল পরিকাঠামোর পাশাপাশি রাশিয়ার প্রথম সারির ই-কমার্স সংস্থা ওজোনের একটি বিশাল লজিস্টিকস কেন্দ্রেও আঘাত হেনেছে ড্রোন। আগুন ছড়িয়ে পড়ায় তড়িঘড়ি সেখান থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে রাশিয়ার জনপ্রিয় সমাজমাধ্যম সংস্থা ভিকে-র একটি ডেটা সেন্টারেও আঘাত হানা হয়েছে। গত চার দিনে রুশ প্রযুক্তি সংস্থা ইয়ানডেক্সের তিনটি ডেটা সেন্টার অকেজো করে দেওয়ার পর এবার সরাসরি ভিকে-র পরিকাঠামোয় হাত দিল ইউক্রেন।

 শহরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের সংযোগকারী একটি আট লেনের ঝুলন্ত সেতুতেও ড্রোন আছড়ে পড়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে বন্ধ করে দিতে হয় পুলকোভো বিমানবন্দর, যা স্বাভাবিক হতে অন্তত এক দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সেন্ট পিটার্সবার্গ ও সংলগ্ন এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও বিপর্যস্ত। গভর্নর বেগলভ জানিয়েছেন, এই হামলায় শহরে অন্তত এক জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচ থেকে পনেরো জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২টি বহুতল আবাসন ও দুটি ব্যক্তিগত বাড়ি। অন্য দিকে লেনিনগ্রাদের গভর্নর আলেকজান্ডার দ্রোজদেনকো জানিয়েছেন, গাতচিনায় ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে বহুতল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং নভোসিওলে এলাকায় পার্ক করে রাখা ৫৫টি গাড়ি দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে চার জনকে।

জেলেনস্কির তোপ

 হঠাৎ কেন এই সর্বাত্মক আগ্রাসনের পথ বেছে নিল কিয়েভ? এর নেপথ্যে রয়েছে কূটনৈতিক বিশ্বাসভঙ্গের তীব্র ক্ষোভ। মাত্র এক সপ্তাহ আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা না করার বিষয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে। সেই কথা মেনে ইউক্রেন তিন দিন রুশ তেল শোধনাগারগুলিতে আক্রমণ বন্ধও রেখেছিল। কিন্তু মস্কো কথা রাখেনি বলে অভিযোগ তুলে গত বৃহস্পতিবার থেকেই ফের পাল্টা আঘাত শুরু করে ইউক্রেনীয় বাহিনী (Russia Ukraine energy ceasefire collapse)।

 রবিবার সমাজমাধ্যম এক্স-এ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্পষ্ট পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ওই যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গত এক সপ্তাহে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস পরিকাঠামোয় মোট ৭৬ বার হামলা চালিয়েছে। এমনকি মস্কোর ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা চাপানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসন আচমকা স্থগিত রাখায় ক্ষোভ গোপন করেননি জেলেনস্কি। তাঁর সাফ বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিলে বা চাপ কমালে শান্তি ফেরে না। বরং তাতে আগ্রাসী শক্তির মানুষ মারার খিদে আর আত্মতুষ্টিই কেবল বৃদ্ধি পায়। শান্তির সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে হলে রাশিয়ার উপরেই সর্বাত্মক চাপ বজায় রাখতে হবে বলে পশ্চিমি বিশ্বের কাছে বার্তা দিয়েছেন তিনি।

রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষত

 ইউক্রেনের এই প্রবল প্রত্যাঘাতের সমান্তরালে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডেও সমানতালে ধ্বংসলীলা চালিয়ে গিয়েছে রুশ বাহিনী। জাপোরিজঝিয়ার আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের প্রধান মিখাইলো সেমিকিন জানিয়েছেন, শহরের আবাসিক এলাকায় রুশ বিমানহানায় এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে এবং ছয় বছরের এক শিশুকন্যা-সহ বেশ কয়েক জন জখম হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দুটি আবাসন, ১৮টি গাড়ি এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

 পাশাপাশি ওডেসার বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় রুশ হানায় অন্ধকারে ডুবে গিয়েছে প্রায় ২৪ হাজার পরিবার। ভলিন, তেরনোপিল এবং সুমি অঞ্চলেও রাতভর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ করেছে মস্কো। মার্কিন সামরিক সহায়তা ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডারে টান পড়ার মাঝেই নিজেদের তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে যে ভাবে পুতিনের ঘরের মাঠে পাল্টা আগুনের ঝড় তুলল কিয়েভ, তা পূর্ব ইউরোপের এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।