মরুভূমির বুকে ‘অক্টাগন’ রহস্য, পরমাণু শক্তি সুরক্ষায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি চিনের

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

চিনের উত্তর-পশ্চিম মরুভূমিতে গড়ে উঠছে এক অভূতপূর্ব সামরিক পরিকাঠামো। উপগ্রহচিত্রে যে নির্মাণকাজ ধরা পড়েছে তাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেজিং এমন একটি প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র-নির্ভর নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, যার লক্ষ্য হলো – শত্রুপক্ষের প্রথম হামলার পরেও পাল্টা পরমাণু আঘাত হানার ক্ষমতা অটুট রাখা।

চোখে পড়লে প্রথমে মনে হতে পারে মরুভূমির মাঝখানে অদ্ভুত এক জ্যামিতিক নকশা। কিন্তু উপগ্রহচিত্রে ধরা পড়া সেই অষ্টভুজ আকারের পরিকাঠামো আসলে চিনের নতুন সামরিক প্রকল্প। উত্তর-পশ্চিম চিনের শিনজিয়াং ও গানসু প্রদেশে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সাইলোকে ঘিরে যে বিশাল নির্মাণকাজ চলছে তা দেখে বিস্মিত প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরাও। সংবাদসংস্থা সূত্রে খবর, উপগ্রহচিত্রে দেখা গিয়েছে,  শিনজিয়াংয়ের হামি পারমাণবিক কেন্দ্র সাইলোর আশপাশে ৮০টিরও বেশি কংক্রিটের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র বা লঞ্চ প্যাড তৈরি হয়েছে।

পাশাপাশি গত ৬ বছর ধরে গড়ে উঠেছে অন্তত ২টি বিশাল অষ্টভুজ আকারের সামরিক ক্ষেত্র। একটি সাইলো থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার এবং অন্যটি প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিকাঠামো কেবল ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য নয়। এখানে রয়েছে সুরক্ষিত বাঙ্কার, অস্ত্রভান্ডার, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রযুক্তি যুদ্ধ পরিচালনার পরিকাঠামো, স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল কেন্দ্র। মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই নেটওয়ার্ক শত্রুপক্ষের নিশানার জন্য অনেক বেশি কঠিন হবে বলে মনে করেছেন বিশেষজ্ঞরা।


হাওয়াই প্যাসিফিক ফোরাম থিঙ্ক ট্যাঙ্কের অন্যতম সদস্য আলেকজান্ডার নিল জানিয়েছেন, মরুভূমির হাজার হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই নির্মাণকাজ চিনের কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষেত্রে বড় প্রস্তুতির ইঙ্গিত। অন্যদিকে হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলির অস্ত্রভান্ডার নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের কিছু আমি আগে কখনও দেখিনি। এটি এক অসাধারণ প্রচেষ্টা।’

চিনের হাতে রয়েছে আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম, যা আমেরিকার প্রায় যে কোনও শহরে পৌঁছতে সক্ষম। বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন প্রতিরক্ষাবলয় মূলত সেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলিকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি করা হচ্ছে। যুদ্ধের পরিস্থিতিতে যদি কোনও দেশ প্রথমে হামলা চালায়, তবুও যাতে চিন পাল্টা পরমাণু আঘাত হানতে পারে, সেই ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি’ বা দ্বিতীয় প্রত্যাঘাতের ক্ষমতা জোরদার করাই এর অন্যতম লক্ষ্য।

উপগ্রহচিত্রে আরও দেখা গিয়েছে, অষ্টভুজাকৃতি কমপ্লেক্সগুলির চারপাশে রয়েছে বিস্তৃত সড়কপথ, রেললাইন, জ্বালানি মজুত করার কেন্দ্র, বিমানঘাঁটি এবং ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত বাঙ্কার। কয়েকটি জায়গায় বড় টাওয়ার ও স্যাটেলাইট ডিশও নজরে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলি ফাইবার-অপটিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক যোগাযোগ কেন্দ্রের অংশ হতে পারে।

এপ্রিল ও মে মাসে উত্তর দিকের একটি অক্টাগন ঘিরে সামরিক মহড়ার ছবিও ধরা পড়েছে। সেখানে বড় বড় তাঁবু এবং বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মতো পরিকাঠামো দেখা গিয়েছে। যদিও এই উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলিতে ঠিক কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হবে তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

চিন বরাবরই ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতির কথা বলে এসেছে। অর্থাৎ তারা দাবি করে, কোনও দেশ আগে পরমাণু হামলা না চালালে চিনও তা করবে না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বেজিংয়ের দ্রুত পারমাণবিক আধুনিকীকরণ আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেডের মালিক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে চিন। একইসঙ্গে এই দেশ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও শক্তিশালী করছে। পেন্টাগনের মতে, চিনের ‘হুওইয়ান-১’ উপগ্রহ নেটওয়ার্ক উৎক্ষেপণের ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে পারে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে সতর্কবার্তা পাঠাতে সক্ষম।

এদিকে লোপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের কাছে আরও একটি অষ্টভুজাকৃতি পরিকাঠামোর খোঁজ মিলেছে। তবে সেটিকে প্রশিক্ষণকেন্দ্র বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।