টাকার মূল্য কমে যাওয়ার প্রভাব এবার স্পষ্ট হচ্ছে ভারতের রপ্তানি ক্ষেত্রে। গত এক বছরে ভারতীয় মুদ্রার দাম ১০ শতাংশেরও বেশি কমেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় পণ্য তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে উঠেছে। ফলে রপ্তানিকারকদের কাছে এটি একটি বড় সুবিধে। গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের মে মাসে ভারতীয় পণ্য রপ্তানি ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে গত ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সোমবার বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রক থেকে প্রকাশিত বাণিজ্য সংক্রান্ত তথ্যে দেখা গিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ২২.৫৬ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে এ বছর মে মাসে দেশটির বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২৮.২১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। পণ্য রপ্তানি ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের মে মাসের ৩৮.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে আমদানিও ২০.৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭৩.৪১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি বহাল থাকলে ভারতের অনেক বাণিজ্যিক সমস্যার সমাধান হবে। তিনি আরও বলেন, ওই অঞ্চলে অস্থিরতা সত্ত্বেও এ বছরের মে মাসে পশ্চিম এশিয়ায় রপ্তানি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতির জেরে চলতি বছরের মে মাসে ভারতের রপ্তানি ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকায় ভারতের রপ্তানি ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের বৃহত্তম বাজারগুলির একটি হওয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই বৃদ্ধি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশে রপ্তানি আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে বাণিজ্যিক কার্যকলাপ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোয় ভারতীয় পণ্য পাঠানোর সুযোগও বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, দেশীয় মুদ্রার দুর্বলতা আমদানি খরচ বাড়ালেও রপ্তানিকারকদের জন্য এটি স্বল্পমেয়াদে লাভজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে উৎপাদন, টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এবং বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বিদেশের বাজারে প্রতিযোগিতার সুবিধে পেয়েছে ভারত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রপ্তানির প্রধান চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য, যা ১১.৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫.০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পেট্রোলিয়াম পণ্য ৫৪.৮৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৪২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে, মে মাসে চা, তামাক, মশলা, কাজু, সামুদ্রিক পণ্য, চামড়া এবং বস্ত্রের রপ্তানি আগের তুলনায় কমেছে।
চলতি অর্থবর্ষের প্রথম দুই মাসে সোনা আমদানি ৬০ বৃদ্ধি পেয়ে ৯.০৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। উচ্চমূল্যের কারণে মে মাসে তেল আমদানি ৫৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২২.৬৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা সেই মাসে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এপ্রিল-মে মাসে এই আমদানি ১৬.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪১.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ভারতীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়ার ফলে এবং বিদেশের বাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার ফলে ভারতের রপ্তানি খাতে নতুন গতি দেখা দিয়েছে। আগামী মাসগুলিতেও এই ধারা বজায় থাকে কি না , সেদিকে নজর রাখছে শিল্প ও ব্যবসায়ী মহল। তবে ভারতীয় মুদ্রার দুর্বলতা ভারতের রপ্তানিকে বাড়তি সুবিধা দিলেও জ্বালানি ও সোনা আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতির চাপও বাড়ছে। আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং জ্বালানির দাম কোন দিকে যায়, তার ওপর ভারতের বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।